শূন্য দুগুণে তিন

//শূন্য দুগুণে তিন

শূন্য দুগুণে তিন

আমার কিশোর কালের অনেকটা সময় গ্রামেই কাটাইছি।
মেলা ভদ্দর আছেলাম।
আশেপাশের বাড়ীর প্রত্যেকটা ঘরের উঠান বারান্দা অন্দর আমার জন্য খোলা ছিলো।
কিশোরী তরুণী যুবতী মাতারী কেউ আমারে দেইক্ষা আনিজি ফিল করতো না।
বরং ঢেঙ্গী মাইয়া গুলা আগানে বাগানে ঘোরার সময় আমারে ডাইক্কা লইয়া যাইত।
যেন আমি অগো বান্ধবী।
আমি মাথা নিচা কইরা হাটতাম সব সময়।
কথা কম কইতাম।
পড়ালেখায় মাথা আছেলো ভাল।
ক্লাস ফাইবে পড়ার সময় হেডমাস্টারের অনুরোধে, ফাইনাল পরীক্ষার আগে দুইজন ক্লাস ফাইবের ছাত্র পড়াইতাম।
ছাত্রগো বাপ মা পাল্লা দিয়া আমারে ভালো মন্দ খাওয়াইতো।
কয়দিনে খাইয়া বেশ নাদুশনুদুশ হইছিলাম।
চেহারায়, ভাবে বেসম্ভব একটা ভদ্র ভাব নিয়া ঘুরতাম।

জমিরুদ্দিন কাহার তিন্ডা মাইয়া,একটা পোলা।
বড় মাইয়াডার বিয়ার দুই বছর পর স্বোয়ামীর লগে ছাড়াছাড়ি হইয়া গেছে।
একটা মাইয়া লইয়া আবার কাহার ঘারে আইসা পরছে।
মাইঝাটা শুঞ্চি বেশ ভালাই আছে।
স্বামী গতরখাটে, পরিশ্রমী।
ছুডুটারে বিয়া দিয়া,এখন জমির কাহার একমাত্র পোলা আবুবকরের জন্য মাইয়া খোজা চলতাছে।
জমির কাহার অল্প একটু খেতি জমি আছে নিজের।
বকর ভাইরে সাথে নিয়া কাহা নিজের সহ মানুষের কিছু জমি চাষ দেয়।
বদলা খাটে,মাটি কাটে,শিতকালে খেজুর গাছ কাইটা রস নামায়।
বাপে পুতে খুবই ধার্মিক।
বকর ভাই মেলা সুর দিয়া কোরান তেলোয়াত করতে পারে।
মাদ্রাসায় ভাল ছাত্র ছিলো।
কেউ ডাকলে মিলাদ পইড়া দেয়।
তাতে একবেলা ভাল খাবার আর কিছু বকশিশ মিলে।
বকর ভাই বিয়া করছে,একদিন গেলাম নতুন বৌ দেখতে।
আমি সিক্সে পাশ দিয়া সেভেনে উইঠা গেছি।
যেসব মেয়েরা আমারে নাবালক ভবতো, এখন অসাবধানতায় চোখ তাদের বুকের দিকে চলে যায়।
আগে মেয়েদের পাত্তাই দিতামনা।

এখনো সেই ভাব নিয়া চলি,কিন্তু ভিতরে একটা কিশের আকাঙ্ক্ষা যেন জানান দিতে চায়।
বকর ভাইর বৌ দেখে বিচলিত হয়ে গেলাম।
অল্পবয়সী, খুব মিষ্টি করে হাসে।
যখন হাসে, যেন চোখও হাসে।
চেহারায় আদুরী ভাব,কিশোরী চঞ্চলতা আমাকে ছুঁয়ে গেলো।
বকর ভাই পরিচয় করাইয়া দিলেন,এইডা আমাগো দুলাল।
আমি দুই সেকেন্ড তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললাম।
নতুন বৌ হাসি দিয়া কইলো বসেন দুলাল ভাই।
একটা পিড়ি আইনা দিলো।
আমি নতুন বৌর মত লজ্জা পাইয়া কইলাম, না থাক বসবোন।
বকর ভাই কইলেন, কি কস বসবিনা?
আরে খাইয়া তারপর যাবি।
পিছনের পুকুর সিচ্চা মাছ ধরছি বেডা, তাজা মাছ তোর ভাবি রাঞ্চে।
বকর ভাই আমারে বেশ আদর করে।
লোকটা আমারও ভালো লাগে।
আমার মতই কথা কম বলে,কাজ আর নামায ছাড়া তাকে কোথাও দেখা যায়না।
আমি বসলাম।
বকর ভাই বললেন,দুলাল তুই একটু ব,তোর ভাবির সাথে গল্প কর।
আমি একটা ডুব দিয়া আই,একসাথে খামুয়ানে।
আমি মাথা নিচা কইরা বইসা রইলাম।
বকর ভাইর বৌ দরজায় খাড়াইয়া আমার দিকে চাইয়া রইছে।
আমার শরমে কেমন জানি লাগতেয়াছে।
ভাবি জিগাইলো,আপনাগো বাড়ি কোনটা?
আমি কইলাম,খালের অপারে।
আমার নানা বাড়ি।
আমি সেখানেই থাকি।
এভাবে প্রশ্ন আর উত্তরে কেটে গেলো কিছু সময়।
বকর ভাই আইলে, তার সাথে মাছ দিয়া ভাত খাইয়া আমি ফিরা আইলাম।
আইতে আইতে এমন মিষ্টি একটা বৌ কল্পনা করতে লাগলাম।
ছোট মাছের ঝোল রাইন্ধা আমার অপেক্ষা করতাছে বৌ…..
বছর ঘুড়তেই বকর ভাইর একটা পোলা হইলো, দুই বছরের মাথায় আরেকটা মাইয়া।
সারে তিন বছরে দুই পোলা এক মাইয়া।
বকরের বৌটার দিকে এখন আর চাওয়া যায়না।
এখনো গেলে সে আমার দিকে বার বার আড়চোখে চায়।
আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
অভাবের সংসার, এত ধকল কিভাবে সহ্য করছে এই মেয়েটি।
বকর ভাই ভদ্র নামাযী।
হয়ত তাই বড়িটরি খাওয়াননা।
হারাম!!
তাহলে আরো বাচ্চা নেবে তারা?!
মেয়েটিতো মরেই যাবে।
আহা! কোথায় সেই চোখে মুখে হাসা চঞ্চলা কিশোরী??
আমি আর ভাবতে পারছি না।
আমার গ্রামের কিশোরীরা একদিন এভাবেই বৌ হয়।
বৌ থেকে হয়ে যায় মহিলা, মাতারী।
কিশোরীর আর তরুণী যুবতি হয়ে উঠা হয়না……!!

লেখক: সেলিম আহমেদ।

শেয়ার করুন
  • 4
    Shares
By | ২০১৮-০৬-১৭T১৩:৩৭:১১+০০:০০ জুন ৮, ২০১৮|গল্প অথবা উপন্যাস|০ Comments

Leave A Comment