সুত্রপাত / ইতিহাসের পাতা / শিক্ষক সংগ্রামীদের অগ্রসৈনিক মোহাম্মদ নাসের

শিক্ষক সংগ্রামীদের অগ্রসৈনিক মোহাম্মদ নাসের

সাদিকুর রহমান:

অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসের (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮-২৮ জানুয়ারি ২০১৬) পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষকতা করতেন। গত ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগেই কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরিসংখ্যানের অধ্যাপক হিসেবে সারা দেশেতো বটেই এমন কি বিশ্বব্যাপী তাঁর পরিচিতি ছিল। এই পরিচিতিটা মৌলিক গবেষণার জন্য। পরিসংখ্যান শাস্ত্রে তাঁর অবদানের জন্য। বিভাগে তিনি সারাদিন অর্থ্যাৎ সকাল ৮/৯ টা থেকে সন্ধে ৭/৮ টা পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে দেখেছি যে তিনি দুপুরের খাবারটাও তাঁর চেম্বারে সেরে নিতেন। মাঝে মধ্যে কাজের ফাঁকে চেয়ারেই একটু ঘুমিয়ে নিতেন। তাঁর বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। আবার পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের ছাড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের কাছেও তিনি পরিচিত ছিলেন। এরও নানাবিধ কারণ ছিলো। এক সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন আদর্শবাদী শিক্ষক, শিক্ষার অধিকার রক্ষা আন্দোলনের জন্য। আন্দোলনরত ছাত্র সমাজের একজন সক্রিয় সমর্থক হিসেবে।

যদিও শিক্ষার অধিকার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তাঁর কর্মকান্ড শুরু হয়েছিল স্কুলে ভর্তির হওয়ার পর থেকেই। স্কুল শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাসের বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয়কর্মী ও নেতা ছিলেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত তিনি সিপিবি’র বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হয়ে কাজ করছেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার সাথে। সাম্যবাদের আদর্শের একজন‘ জৈবিক বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেছিলেন ‘আমাদের শিক্ষক’।

এখানে বলে নেয়া ভালো যে, স্বপ্ল পরিসরে ‘আমাদের শিক্ষক’ মোহাম্মদ নাসের এর বিশাল কর্মকান্ডের কিংবা তাঁরমতো মানুষের জীবন, আদর্শ, চিন্তা ও কর্মকান্ডের মূল্যায়ন সম্ভব নয়। যদিও এই লেখায় প্রথমে তাঁর ছোট্ট একটি পরিচিতি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর শেষের দিকে বলছি তিনি ‘আমাদের শিক্ষক’। পেশায় একজন শিক্ষক হলেই যে কেউ ‘আমাদের শিক্ষক’ হয়ে ওঠতে পারেন কি ? হয়ত পারেন অথবা পারেন না। তাহলে মোহাম্মদ নাসের কে ‘আমাদের শিক্ষক’ কেন বলছি বা লিখছি ? প্রশ্নটা যে কেউ করতে পারেন। আর সেখানেই তাকে বুঝতে পারার বিষয়টা পাওয়া যাবে। সরাসরি বলতে গেলে ‘আমাদের শিক্ষক’ অভিধা দিয়ে তাকে ‘সমাজের বা মানুষের শিক্ষক’ বোঝানোর ব্যাপারটা নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার ও গবেষণার বাহিরেও বৃহত্তর মানব সমাজের ‘সৃজনশীল বিকাশ’ এর একজন নিরন্তর ‘জৈবিক বুদ্ধিজীবী’ ছিলেন মোহাম্মদ নাসের। মানব সমাজের সৃজনশীল রূপান্তর প্রক্রিয়ায় নিবেদিত ও নিরন্তর প্রয়াস প্রযত্নে তিনিই ‘মানুষের শিক্ষক’ অথবা ‘আমাদের শিক্ষক’ কিংবা সমাজের সৃজনশীল বিকাশে ‘জৈবিক বুদ্ধিজীবী’ হয়ে ওঠেছিলেন।

কেননা তিনি ‘তত্ত্ব ও প্রয়োগের’ সম্পর্কের ভাববাদী খোলসের বিরুদ্ধে মার্কসীয় দর্শনের তত্ত্ব ও প্রয়োগের ঐক্যে নিরন্তর কর্মকান্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঐক্যকে প্রতিষ্ঠার কাজে সারা জীবন লিপ্ত ছিলেন। তিনি কেবল বক্তা বা বিজ্ঞানী বা চিন্তক হিসেবে নয় বরং বাস্তবজীবনে অংশগ্রহন করতেন একজন সংগঠক ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে। সেই সাথে তিনি বস্তু বিছিন্ন কোন গাণিতিক স্তরের চেয়ে উন্নততর স্তরে সক্রিয় থাকতেন। কাজের মধ্যে প্রয়োগ বিদ্যাকে বিজ্ঞানে পরিণত করার চেষ্টা করতেন। আর এভাবেই চেষ্টা করতেন ইতিহাসের মানবিকবাদী ধারার উত্তোরণ, যা ছাড়া একজন কেবল ‘বিশেষজ্ঞই’ থেকে যায়।

মোহাম্মদ নাসের কেবল ‘বিশেষজ্ঞই’ ছিলেন না। তিনি একাধারে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক ছিলেন। একজন মার্কসবাদী কমিউনিস্ট হিসেবে কিংবা ‘বিপ্লবী’ অথবা ‘জৈবিক বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে অগ্রগ্রণ্য ভূমিকায় পৌছতে পেরেছিলেন। মার্কসবাদী হিসেবে তিনি জনগনকে কা-জ্ঞানের আদিম দার্শনিক অবস্থায় রাখতে চাইতেন না। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে জনসাধারণকে জীবন সম্বন্ধে উন্নততর এক ধারণার পথে চালিত করতে কাজ করতেন। বুদ্ধিজীবী ও আম-জনতার সংযোগের ওপর যে জোরটা মার্কসীয় দর্শনে দেয়া হয়তা যে বৈজ্ঞানিক কাজ কর্মকে চেপে দেওয়া কিংবা অধ:স্তন জনগণের মধ্যে এক ধরণের সংহতি বজায় রাখার জন্য নয়, বরং এর লক্ষ্য যে এমন একটি বৌদ্ধিক নৈতিক জোট তৈরী করা, যার ফলে শুধুমাত্র কোন এক ছোট বুদ্ধিজীবী গোষ্টির নয়, সমগ্র জনসমষ্টির বৌদ্ধিক প্রগতির কাজটা রাজনৈতিকভাবে সম্ভব হতে পারে সেজন্য তাঁর বিরামহীন প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করি। তাঁর কাজের মধ্যেই দেখা যায় যে, দর্শনের বোধ, অভিজ্ঞতা ও চর্চায় জনগনকে প্রনোদিত করতে গিয়ে বৌদ্ধিক সমালোচনা ও আত্মসচেতনতা ও আত্মআবিষ্কারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

আর সেই জন্য ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর প্রচন্ড গুরুত্ব দিতেন এবং তত্ত্ব ও কর্মের ঐক্যের চর্চায় অবিচল থাকতেন। রাষ্ট্র সমাজ সংস্কৃতি শিক্ষা, গবেষণা , শ্রমিক, কৃষকসমাজ, পরিবেশ প্রকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গীবাদ, সামাজ্রবাদ, সামাজ্যবাদীযুদ্ধ, মানুষের মুক্তির সংগ্রাম ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ে তাঁর চিন্তা ও অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এসব নিয়ে তাঁর বিস্তর লেখামালা আছে এবং বিভিন্নরূপে সংগঠিত গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশগ্রহনে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন সমাজের বিজ্ঞানটা বুঝা হচ্ছে সবচেয়ে জরুরী ও কঠিনকাজ। এই বিজ্ঞান না বুঝতে পারলে কিছু দিয়েই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয় । তিনি পরিসংখ্যান শাস্ত্রের যেমন পন্ডিত ছিলেন তেমনি তিনি সামাজিক বিজ্ঞানেও অসাধারণ পন্ডিত ছিলেন। বস্তুত মোহাম্মদ নাসেরকে মূল্যায়ন কিংবা তাঁর জীবন সংগ্রাম ও চিন্তা নিয়ে গভীর অধ্যয়ন সমাজের জন্যই প্রয়োজন। তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেলেন সৃজনশীল সমাজ রুপান্তরের লক্ষ্যে তাঁর জীবনাদর্শ, নানাবিধ বিষয়ে তাঁর চিন্তা ও অনুপ্রেরণা । আর এভাবেই তিনি আমাদের সাথে আছেন এবং থাকবেন। তাঁর মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্বরণ করছি।

Comments

comments