সুত্রপাত / সম্পাদকের কলম / শায়লাকে অপদস্ত করা বাদ দিন

শায়লাকে অপদস্ত করা বাদ দিন

লাবণী মন্ডল:

আমি শায়লাকে ডিপেন্ড করছি না, শুধু নারী হওয়ার কারণে যা করছেন সেটা অন্যায়, ঘোরতর অন্যায়। এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া বিবেকে বাঁধে। সুতরাং, প্রতিবাদ করছি। নারীমূলক গালি বাদে যা ইচ্ছে করেন। প্রয়োজনে ফাঁসিও চান। আপনারা কোনোভাবেই থামছেন না, মানেটা কি! শ্রাবণীর জমি আবাদী না হলে আবাদ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেই যাচ্ছেন। আপনাদের হলোটা কি? ওখানে শ্রাবণীদের সংখ্যা তো খুব কম ছিল। জাকিরদের সংখ্যা ছিল তিনগুণ। জাকিরদের নিয়ে আপনাদের ক্ষোভটা যতটা না, তার চেয়ে বেশি শ্রাবণীকে নিয়ে। কি সমস্যা! কি মানসিকতা! জমি দেখলেই আবাদ করার ইচ্ছে জাগে? হাস্যকর তো!

আন্দোলন নিয়ে কথা নেই। জাকিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে মাথাব্যথা নেই। যত মাথাব্যথা শ্রাবণীকে নিয়ে। আচ্ছা, শ্রাবণীর শরীর নিয়ে আর কত করবেন! শ্রাবণীকে আঘাত করার জন্য আর কোনো হাতিয়ার নেই? ওর বড়ি কেমন, হাত কেমন, চুল কেমন, কত ইঞ্চি কোমড় এ নিয়ে তো আপনাদের খুব বেশি ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে। কতজন নিজে নিজে হস্তমৈথুন করেছে শ্রাবণীর শরীর দেখে ধারণা করাও মুশকিল। জাকিরদের ছবি আলাদাভাবে মার্ক করছেন না কেনো? শ্রাবণীর ছবি আলাদা মার্ক করে, তার হাতে ছুরি ধরিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? নারী বন্ধুদের অনেকেই তা করে বেড়াচ্ছেন। নারী মানে কলঙ্ক, নারীর সম্মান থাকলো না। হায় হায় রব উঠেছে। গেল গেল সব গেল। ধরেন, এ ধরনের গণআন্দোলনে আমাকে কেউ পিটালে আমি কিন্তু প্রতিরোধ করবো। পুলিশকে মেরেছি বহুবার। নারী পুলিশকে থাপ্পড় মারতে গিয়েছি। ছবিও আছে। এখন নারী হওয়ার কারণেই যদি বলেন ‘ডাইনী’ ‘মাগি’ ‘ ‘শাখচুন্নী’ তা হলে বিষয়টা অন্যায়। বড়ই অন্যায়। শ্রাবণীদের রাজনৈতিক শিক্ষাই এটা। তা নিয়ে বলুন। শ্রাবণীরা পুরুষতন্ত্রের রক্ষক তা নিয়ে কোনো কথা নেই। কারো একটা ভালো লিখা তো দেখলাম না! শ্রাবণীর হাতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য পুরুষ সমাজ আকুল হয়ে উঠেছে। আহারে, ‘শায়লার নরম হাতে মাইর খাওয়ার জন্য হলেও, আন্দোলনে যাবো’ বলে বেশ যৌনসুখও নিচ্ছেন। এ কি গো! আপনারা এমন কেনো!

লাভলী যখন ছুরি বসালে প্রেমিকের পিঠে তখনও চিনলাম আপনাদেরকে, এবার শায়লার বেলায়ও চিনলাম। আপনাদের আসলে জন্মের পর থেকেই চিনি। ভুলে যাই, বন্ধু, প্রেমিক, স্বামী ভেবেই ভুলে যাই। আসলেই, আপনারা যে পুরুষ ছাড়া আর কিছু না। নারীকে দেখলেই পুরো শরীরে কি যে অনুভূতি পান।  আহা, নারী! আহা, নারীবাদী পুরুষ!  শায়লা কার সাথে শোয়, শায়লা কেনো কুয়েত হলের নেত্রী, শায়লা কেনো সুন্দর তাও আপনাদের চিন্তা। আরে বাব্বা! শায়লার চিন্তা একেবারেই নোংরা, একেবারেই চিন্তাহীন। তা তো বুঝি, নাকি! তা যদি না হতো, তবে কি আর ‘ছাত্রলীগ’ করতো! শায়লার কাছ থেকে আপনার প্রত্যাশা কি? ওই ভীড়ের মাঝে আপনাকে রক্ষা করা? হাহাহা, হাস্যকর নয়– বলুন! শায়লা করে ছাত্রলীগ, গেছে জাকিরের নেতৃত্বে। সবাই মারছে আন্দোলনকারীদের আর শায়লা দাঁড়িয়ে থাকবে! ওর পদ-পদবী থাকে তবে?

অনলাইন নিউজগুলোকে থু। যারা শেয়ার করে বলে বেড়াচ্ছেন, এই সেই শায়লা! ‘ছাত্রলীগের নেত্রীরা দেহব্যবসায়’ জড়িয়ে পড়ছে আর আপনারা শেয়ার দিচ্ছেন। আর কেউ দেহব্যবসা করে না বা দেহব্যবসার প্রশ্নে আপনার দৃৃষ্টিভঙ্গি কি? শায়লা চাঁদাবাজি করে আপনার মনে বেশ সুখানুভূতি। আর জাকিররা যখন পাহাড় গড়ে সম্পত্তির তখন চুপ! শায়লার রাজনীতি তো চাঁদাবাজি করতেই শেখায় নাকি! আপনাদের প্রত্যাশাগুলো বুঝে উঠা দায়। শায়লা নারী বলে ওর দলেও যে নির্যাতিত তা জানেন? জানেন না, কোনোদিন জানবেনও না! এই পৃথিবীর কোথায় কোনপ্রান্তে নারী সুখে আছেন! এই ভোগবাদীর সংস্কৃতিতে নারীর যৌনাঙ্গ তো পণ্য, তবে কি সুখ! আমি যখন নারীমুক্তি চাই তখন সব নারীরই মুক্তি চাই। আমি যখন মানবমুক্তি চাই তখন শোষিতদের জোর দেই। এই যে তফাৎ। এটা উপলব্ধি করা জরুরী।

শায়লাকে নিয়ে জয়গান আমি গাচ্ছি না। যেমন, হাসিনাকে নিয়েও গাই না। তবে, কেউ যদি বলে ‘হাসিনা নারী হয়ে কি পাওয়ার, নারীদের হাতে ক্ষমতা দিতে নেই।’ তখন প্রতিরোধ করি। তীব্রভাবেই বলি নারী শব্দটি না বলে শাসক বলের। শাসকশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করাকালীন নারীপুরুষ থাকে না। ক্ষমতা, অর্থই মুখ্য। যার ক্ষমতা আছে তার অর্থ আছে, ঠিক তেমনি যার অর্থ আছে তার ক্ষমতা আছে। একটা অপরটার পরিপূরক।  আমার মা আমাকে একবার অবজ্ঞারস্বরে বলেছিলেন, ‘তুমি না নারীমুক্তি চাও, তবে হাসিনাকে গাল দিলে খুশি হও কেনো। হাসিনা নারী হওয়ার কারণে বাড়তি অপমানের স্বীকার কেনো হবে!’ কথাটা খুব চমৎকার। হাসিনা জাস্ট লৈঙ্গিকভাবে নারী কিন্তু তার সবতো শাসকচরিত্র। আর ভয়ংকরভাবে তিনি পুরুষতন্ত্রকে ধারণ করেন। নারী হওয়ার কারণে আলাদাভাবে অবহেলিত করার মানসিকতা পরিহার করবেন না! কেনো করবেন না বলুন! নারী তো মানুষই। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি।

শায়লাকে নিয়ে ট্রল ট্রল করতে আপনি আপনার খাওয়া, দাওয়া ভুলে গেছেন। মানুষ এত সময় কই পাই? আজ কিছুক্ষণ এক পরিচিত বন্ধুর পোস্ট দেখলাম, যেখানে শায়লার শরীরকে অনুবাদ করেছে। ‘ওর শরীর ঢকের না, চামড়া লেগে গেছে। হয়তো কতজনের লগে ঘুমিয়েছে, স্ব্বপ্নদোষ হতে হতে এ অবস্থা!’ কি বাজে, কি ভয়ংকর! তাকে মেসেজ করে জানালাম এটা কি বলেন? কি দৃৃষ্টিভঙ্গি?  বেচারা খুব আকুপাকু করলো, শায়লাকে পাওয়ার বাসনা প্রকাশ করার আগে ভাববেন, এ সমাজের কীট আপনিও। আপনার সাথে অণ্ডকোষ আছে, পেনিস আছে বলেই সব হয়ে গেল- ব্যাপারটা মোটেও তা নয়।  ওত সস্তাভাবে ভাববেন। বড় লাগে আপনাদের নোংরা মানসিকতা। আমিও আনাদোলনকারীদের পক্ষের মানুষ। যদি ছাত্রসংগঠনের এখনো জড়িত থাকতাম তবে আমিও মাইর খেতে পারতাম শায়লা চুলও ছিড়তে পারতো। আমি ওড়না না ছিড়লেও শায়লাকে লাথি, ঘুষি, থাপ্পড় দিতাম, প্রয়োজনে দঁাতও ভেঙ্গে দিতাম। কেননা, সবসময় গান্ধী মতাদর্শকে ধারণ করারা আমার রাজনৈতিক শিক্ষা না। শুধু মাইর খেয়েই যাবো, কোনো প্রতিবাদ করবো না। প্রতিবাদ করলে, নেতারা মুখ গোমড়া করবে তাও ভাবতাম না।

শায়লাকে নারী হওয়ার কারণে অপদস্ত করা বাদ দিন। শায়লার রাজনীতি নিয়ে কথা বলুন। তাকে আর একবারও মাগি, ডাইনী বলবেন না। একেবারেই বলবেন না। তার শরীরে আবাদ করার ইচ্ছেটাও দমন করুন। আবাদ করতে চাইলে অবাদী লাগবে এই চিন্তাও পরিহার করুন। আবাদ জমিতেও আবাদ করারা যায়। আপনি অবাদী কি আবাদী সে প্র্শ্ন কেউ করছে না কিন্তু! এবার প্রসঙ্গ পাল্টে শায়লার শ্রেণীচরিত্র নিয়ে লিখুন তো। আর সাথে সাথে বেনজীর, তমা, আশা, ঊর্মিরা যাতে শুধু মাইর না খায় প্র্য়োজনে মাইর দিতে পারে সেটা বলুন। আর্মস ট্রেনিং না দিলেন আপাতত লাথি, ঘুষির ট্রেনিংটা দিন। এটা রাজনীতির শিক্ষা।
আর যদি শায়লাকে বকতেই থাকেন, তারর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে রং তামাশা করতেই থাকেন তবেবে বুঝবো জাকির আর আপনাদের তফাৎ নেই। বদরুলদের সাথেও নেই কোনো তফাৎ। একইসাথে নারী বন্ধুরাও শায়লাকে ডাইনী না বলে বলুন, এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাপনার ক্ষুদ্র অংশে শায়লা। সুতরাং ফ্যাসিবাদকে ঘৃণা করুন। আর আন্দোলনকারীর প্রতি অনুরোধ এরকম মানববন্ধন, টন্ধন বাদ দিয়ে এবার ঝেড়ে কাশুন। আসলেই কি চান, কি উদ্দেশ্য!

একটু ঘেরাও, টেরাও করুন। অতীত ইতিহাসকে শুধু মুখে ধারণ না করে মাঠেও প্রমাণ করুন। মুখোশধারী পুরুষদের মুখোশ উন্মোচন আজ নারসমাজের দায়িত্ব। সুতরাং, নারী তুমি সকল অন্যায়ের প্রতিবাদে জেগে উঠো। পুরুষতন্ত্রের ধারকবাহকদের ভিত কাঁপিয়ে দাও। পুরুষতন্ত্রের রক্ষকভক্ষকরা তোমার, আমার পাশেই ঘাপটি মেরে আছে। একটু দৃষ্টিটাকে পরিশুদ্ধ করো পেয়ে যাবে।  আমি নিপীড়িতদের পক্ষে। সুতরাং আমি নারীর ও পক্ষে।

লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, আমার কলম।

Comments

comments