সুত্রপাত / শিক্ষা ও গবেষণা / রুপকথার তিক্তকথা ও শিশু সাহিত্যিকদের কাছে একটি প্রস্তাব

রুপকথার তিক্তকথা ও শিশু সাহিত্যিকদের কাছে একটি প্রস্তাব

তামান্না তাবাসসুম :

আমাদের ছোট বেলার স্মৃতির একটা বড় অংশ রুপকথার গল্প।এখনকার বাচ্চারা গল্প শুনে খুব একটা অভ্যস্থ না হলেও রুপকথার গল্পের এনিমেশন মুভি গুলো দারুন জনপ্রিয় তাদের মাঝে। শিশুদের আকর্ষনীয় উপায়ে ছোটবেলা থেকে গড়ে তোলার জন্য রূপকথার ভুমিকা অপরিসীম।ছোট বেলায় যখন বুদ্ধির বিকাশ হয় তখন জীবন সম্পর্কে নানান রকম শিক্ষার হাতেখড়ি হয় রূপকথার মাধ্যমেই।তাই গল্প নির্বাচনে সচেতন হতে হবে অভিভাবককে।

রুপকথার উপকারিতা নিয়ে যে সকল লিখা পাওয়া যাবে তার মধ্যে অন্যতম পয়েন্ট গুলো হলো -এর মাধ্যমে শিশু ন্যায়-অন্যায়, নীতি বোধের শিক্ষা পায়। ভাল মন্দের তফাৎ তার মস্তিস্কে সহজেই ঢুকে যায় যা বাকি জীবনে তার আচরন, চিন্তা -ভাবনায় অবচেতন ভাবে থেকে যায়।

তাহলে তো তার মাথায় এগুলোও থেকে যায় -একজন রাজার (পুরুষের) পক্ষে একাধিক রাণী (স্ত্রী) রাখা একদমই স্বাভাবিক ব্যাপার। রানীকে যে কোন সময় বনবাসে পাঠানো (ঘর থেকে বের করে দেয়া/নির্যাতন করা) যায়। রানীকে/রাজকন্যাকে অবশ্যই হতে হবে খুব রুপবতী, নইলে তার কোন দাম নাই। আচ্ছা কখনো কি এই প্রশ্নটা মাথায় এসেছে; বিউটি এন্ড বিস্ট’ একদাকার রাজপুত্রের জায়গায় যদি কুচ্ছিত রাজকন্যা হতো তাহলে কি সুদর্শন রাজপুত্র তার ভাল মনের পরিচয় পেয়ে তাকে ভালবাসতো? কেন এমন কোন কাহিনী নাই রুপকথায় ?
বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে নিজে কিছু করতে চেষ্টা না করে শুধু রাজপুত্রের জন্য অপেক্ষা করবে। তার ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি একমাত্র রাজপুত্র। সিন্ডারেলার গল্প পড়ে মনে আসতেই পারে বড়লোক ছেলে বিয়ে করতে পারলেই সফলতা! সিন্ডারেলা তো পালিয়ে গিয়ে কাজ করেও ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারতো।
ভারতীয় রুপকথাগুলোতে রানীদের ভুমিকা শুধু উত্তরাধিকার তৈরী। বাচ্চা না হলে রানীর কোন দাম নেই। তাদের আত্মসম্মান বলতে কিছু নেই। এই রূপকথাগুলোর পরতে পরতে রাণীর (নারীর) নেতিবাচক ইমেজ কিংবা এর বিপরীতে রাজার বা রাজকুমারের (পুরুষের) ইতিবাচক ইমেজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এমনকি নবজাত সন্তানের কোনো শারীরিক খুঁতের দায়ভারের চাপ নারীদের উপরেই।
বাচ্চারা নারী কে অবলা করে প্রথম দেখতে শেখে রুপকথাতেই। ছোট বেলা থেকে এসব গল্পশোনা শিশুরা নিশ্চয় বড় হয়ে নারীকে খুব সম্মানের চোখে দেখবে না। আর কন্যা শিশুরাও তেমন দুর্বল ব্যক্তিত্ব ই মনে মনে পুষে রাখে।

একটু ইন্টারনেট সার্চ দিলেই ফেয়ারি টেইলসের ব্যড ইফেক্ট নিয়ে বিস্তারিত অনেক লেখা পাওয়া যাবে। যতই আইন করা হোক না কেন, মানে গেঁথে থাকা ধারনার পরিবর্তন না আনতে পারলে নারীর প্রতি সহিংসতা, বিদ্দেশপূর্ণ মনোভাব, মেয়েদের খাটো করে দেখা বন্ধ করা অসম্ভব ।
কিন্তু এর সমাধান কি? রূপকথার গল্পের ভাল দিক থেকে শিশুদের বঞ্চিত করা ঠিক হবে না, শিশুর কল্পনার জগৎ বিস্তৃতিতে এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে?

রূপকথা”র কাহিনীগুলো এসেছে নানান হাত ঘুরে, মানুষের মুখে মুখে বয়ে চলে সময়ের সাথে রূপকথার বিবর্তন হয়। এসব গল্পের অরিজিনাল লেখক জানা কঠিন । তাই আমরাও চাইলেই পারি একটা সুন্দর সমাজের জন্য চেনা গল্পের অচেনা মোড় আনতে।
সিন্ডারেলার গল্প তো আমরা সবাই জানি। আচ্ছা, সিন্ডারেলাকে যে ওর সৎমা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দিল, এরপর প্রিন্স চার্মিংকে এসেই কেন তাকে উদ্ধার করতে হবে? নিজের দুরবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কি নিজেই খুঁজে নেয়া সম্ভব নয় ? কিংবা জুতার মাপই কেন হবে একজন মানুষের জীবনসঙ্গী নির্ধারণের মাপকাঠি ? কেন এক রাতের সুন্দরী নাচের সঙ্গীকেই বাকি জীবনের সঙ্গী বানাতে হবে ?
ওয়াল্ট ডিজনির চিরায়ত কাহিনী অবলম্বনে নব্বইয়ের দশকের তৈরি হয়েছিল চমৎকার একটা আনিমে । ছাব্বিশ পর্বের এ আনিমের নাম “সিন্ডারেলা মনোগাতারি”।
শুরুটা হয় প্রচলিত গল্পের মত করেই। এরপর ২য় এপিসোড থেকেই মোড় ঘুরে যায় দারুণভাবে। রূপকথার গল্পের গতানুগতিক পথ অবলম্বন না করে আনিমেটি দেখিয়েছে, সিন্ডারেলার সৎমা তার কাছ থেকে সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়। তাতে দমে যায়না সে। বরং তার সামনে আসা চ্যালেঞ্জকে হাসিমুখে মোকাবেলা করতে বদ্ধপরিকর হয়। তাকে সাহায্য করার জন্যে তার “ফেইরি গডমাদার” মিস পল তার পোষা প্রাণীগুলোকে কথা বলার ক্ষমতা দিয়ে দেন। তাদের সাথে নিয়ে সিন্ডারেলা তার ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টায় থাকে।
রাজকুমার চার্লস। রাজার একমাত্র সন্তান এবং উত্তরাধিকারী। তাকে রাজ্য পরিচালনার জন্যে তৈরি করে তুলতে রাজার চেষ্টার অন্ত্ নেই। রাজকুমার চায় যে রাজ্যটায় সে একদিন রাজত্ব করবে, সেই রাজ্যটাকে সে কাছ থেকে দেখতে চায়। রাজ্যের মানুষদের চিনতে চায়। আর তাই বন্ধুর পুরনো কাপড় ধার নিয়ে প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে প্রায় প্রতিদিন ছদ্মবেশী চার্লস বেরিয়ে পড়ত রাজ্য পরিদর্শনে।
এভাবে শহরে ঘুরতে ঘুরতে একদিন রাজকুমারের দেখা হয়ে যায় সিন্ডারেলার সাথে। বিভিন্ন ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে আস্তে আস্তে তাদের দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়।
তারা দুজন একসাথে বিভিন্ন মজার এবং ইন্টারেস্টিং ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে থাকে। সিন্ডেরেলার অসুস্থতার সময় যেমন চার্লসকে ঘরের কাজ করা শিখতে হয়, তেমনি চার্লস সিন্ডারেলাকে শেখায় অসিচালনা।
সেখান সেই জুতো আর নাচ ও থাকে কিন্তু আরো বেশি ড্রামাটিক ভাবে। সব টুইস্ট বলে দিলে তো আর দেখার মজাই থাকবে না, জানাতে হলে আজই দেখে ফেলুন। আমার কিন্তু সিন্ডারেলা মনোগাতারি” টাই বেশি ভাল লেগেছে।
সম্প্রতি ক্যলিফোর্নিয়ার আরেকটি উদ্যেগ খুব সাড়া ফেলেছে। বইটির নাম Good Night Stories for Rebel Girls. এ বইটি শিশুদের ১০০ জন অসাধারণ নারী ও তাদের জীবনের সাথে পরিচয় ঘটাবে। বিজ্ঞানী, শিল্পী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জীবনী রুপকথার ঢঙে লেখা সাথে আছে পুরো পারা চমৎকার ইলাস্টেশন। এ বইয়ের দুই লেখিকা হলেন Elina Favilla ( মিডিয়া উদ্যেক্তা ও সাংবাদিক) এবং Francesca Cavallo ( লেখিকা ও ডাক্তার) । বইটি এম্যাজন ডট কম এ ওর্ডার করে সংগ্রহে রাখতে পারেন। তাদের ফেসবুক পেইজ https://www.facebook.com/rebelgirls/ ।

আমি সেদিন আমার পিচ্চি কাজিন গুলাকে ‘সাত ভাই চম্পা’ গল্পের সেক্সিস্ট দিক গুলো একটু মডিফাইড করে শুনিয়েছি। আমি যেহেতু কোন শিশুসাহিত্যিক না, আর এটা একটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ, তাই ভূলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি। গল্পটা ছিলো এমন –

এক দেশে ছিল এক রাজা আর এক রানী। তারা দুজনে দুজনকে খুব ভালবাসতো। অনেক দিন অপেক্ষার পর রাজা-রানীর ঘরে আসছে নতুন অতিথি। রাজ্যের সবাই এখন খুব খুশি ।
খুশিনা শুধু রাজার ছোট ভাই প্রধানমন্ত্রী আর তার বউ। রাজার সন্তান হলে তো সেই পরবর্তী রাজা হবে, তার যে আর রাজা হওয়ার সাধ পূরণ হবে না। সে আর তার বউ মিলে আরে এক দুষ্টু বুদ্ধি । মন্ত্রির বউ রাজার কাছে গিয়ে বলে রানীর বাচ্চা হওয়ার সময় সে রানীর সাথে থাকতে চায়। এ অবস্থায় রানীকে অন্যের কাছে তুলে দিয়ে সে শান্তি পাবে না। রাজা ভাবে তাহলে তো ভালোই হয়, আপন জন পাশে থাকলে সেও শান্তি পাবে।
রানীর সাতটি ফুটফুটে ছেলে আর একটি ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দেয়। মন্ত্রির বউ অনেক সোনার গহনা দিয়ে হাত করে দাই কে। তারা বাচ্চা গুলোকে প্রসাদের পিছনে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। আর রাজার কাছে বলে তার আটটা ব্যাঙ এর বাচ্চা হয়েছে।
জ্ঞান ফিরে এই কথা শুনে রানী খুব কষ্ট পায়। দুঃখে দুঃখে রাজা-রানীর দিন কাটে না রাত কাটে না।
কিন্তু কয়দিন আর এভাবে থাকা যায়। সন্তানের দুঃখ রানী ভূলে থাকে জীবকে ভালবেসে। রানীর আদেশে রাজ্যের লোকেরা ক্ষুধার্ত কুকুরকে খাওয়ায়, অতিথি পাখিদের মারে না। বাচ্চারা বিড়াল কুকুরকে ঢিল ছোড়ে না। তাই এরা সবাই রাজারানীর যেন ভাল হয় তাই প্রার্থনা করে।
এদিকে ঘরে আরেক ঘটনা। সাতটা রাজপুত্র কে মাটি চাওয়া দেয়ার পর দাই যেই না কন্যাটিকে মাটি চাপা দিতে যাবে তখনি তা দেখে ফেলে বাগানের মালিনী। তার খুব মায়া হয় শিশুটির জন্য। সে বলে এখানে ফেলে দিলে তো এমনিতেই মারা যাবে। আবার মাটিচাপা দেয়ার কি দরকার? দাই ভাবে ঠিকই তো। সে বাচ্চাটাকে ফেলে চলে যায়। তখন মালিনী শিশুটাকে নিয়ে পালিয়ে অনেক দূরের দেশে চলে যায়। তার নাম দেয় পারুল। শিক্ষা-দিক্ষায় রাজার মেয়ের মতই গড়ে তোকে তাকে। ১৮ বছর তাকে নিজে দেশে পাঠায় তার অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য।
রাজ্যে ঢুকেই পারুলের কানে আসে ঘোষনা – রাজা অসুস্থ হওয়ার তার ছোট ভাইকে রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দিবেন। পারুল ছুটে চলে যায় সেখানে যেখানে তার সাত ভাইকে পুতে রাখা হয়েছিল। দিয়ে দেখে সেখানে ফুটে আছে সাতটা চম্পা ফুল। পারুল গেয়েওঠে- ও সাত ভাই চম্পা জাগোরে, ফুলগুলো ও গেয়ে ওঠে – কেন বোন পারুল ডাকোরে, তখন সে ফুলদের কানে কানে একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেয়।
এদিকে রাজ্যে ঘরে এক আজব ঘটনা। নতুন রাজা সিংহাসনে বসবেন। তাকে তো ফুলের মালা দিয়ে বরন করতে হবে। কিন্তু রাজ্যের কোন গাছে আজই ফুলফোটে নি। ফুলেরাও যে চায় না এই দুষ্টু লোক রাজা হোক। ঘোষনা দেয়া হল – যে ফুলের সন্ধান দিতে পারবে তার জন্য আছে বিশেষ পুরুস্কার।
তখন পারুল যায় রাজপ্রাসাদে। গিয়ে বলে প্রাশাদের পিছনে ডোবার কাছে গিয়ে দেখুন ফুটে আছে সাতটি ফুটফুটে চম্পা ফুল।
দাসীরা যায় ফুলের সন্ধানে। কিন্তু একি, ফুল ছিঁড়তে গেলেই তা উঠে যায় অনেক উপরে, হাতের নাগালের বাইরে। এই আশ্চর্য খবর শুনে রাজা, মন্ত্রি, মন্ত্রির বউ যায় সেই গাছের কাছে। তখনো একি কান্ড। গাছেরা তাদেরকেকে দেখে বলে ওঠে -“দেবনা দেবনা ফুল। যদি আসে মহারানী তবে দেব ফুল।” খবর পেয়ে রানী আসতেই, ফুলগুলো সব মা মা বলে রানীকে জরিয়ে ধরে আর সব ষড়যন্ত্রের কাহানি বলে দেয়।
মন্ত্রী আর তার বউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। প্রাণ ফিরে পায় সাত রাজপুত্র।
আর যার বুদ্ধির জন্য সবাই সব ফিরে পেল, সেই পারুলের মাথায় রাজ মুকুট পড়িয়ে দেয় রাজা। পারুল রাজ্যের সবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটায়। ।

 

আবারো ক্ষমাপ্রার্থনা করছি একটা বোরিং গল্প শুনিয়ে সময় নষ্ট করার জন্য। আমি না হয় পারি না শিশুতোশ গল্প লিখতে। কিন্তু যারা এই নিয়ে কাজ করেন তারা এই ব্যপারটা নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। শিশুর মনস্তাত্বিক ব্যপার চিন্তা করে রুপকথার গল্প গুলাকে একটু মোডিফাইড করে প্রকাশ করা যায় কিনা।

লেখক : শিক্ষার্থী , ইংরেজী বিভাগ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!