সুত্রপাত / ধর্ম ও দর্শন / মানুষ হতে হবে নাকি ভালো মানুষ ?

মানুষ হতে হবে নাকি ভালো মানুষ ?

আফরিন শরীফ বিথী:

‘মানুষ’ এবং ‘ভালো মানুষ’ শব্দ দুটি কি সমার্থক শব্দ? যদি সমার্থক হয় তবে ‘ভালো মানুষ’ এবং ‘খারাপ মানুষ’ এই দুই প্রকারে আমরা মানুষকে বিশেষায়িত করি কেন? ‘মানুষ’ এবং ‘খারাপ মানুষ’’-এ বিভাজিত করলেই তো পারি! প্রশ্ন হচ্ছে, ‘মানুষ হতে হবে’ নাকি ‘ভালো মানুষ’ হতে হবে?

আচ্ছা মানুষ ঠিক কি কি করতে পারবে আর কি কি করতে পারবে না তার কি কোন নির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা আছে? কেউ কোন খারাপ কাজ করলেই আমরা বলি ‘মানুষ না’, ‘অমানুষ’। অমানুষ বলতে কি বুঝায়? মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণী, তাই তো? অন্যান্য প্রাণী মানেই কি খারাপ? মোটেই নাহ! বরং আমি বলব মানুষের চেয়ে অন্য প্রাণীরাই নীতিগতভাবে বেশি সঠিক। তারা কি করবে আর কি করবে না তার একটা মোটামুটি দিক নির্দেশনা আছে। একটা প্রাণী কি করতে পারে আর কি করতে পারে না তা সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকে। প্রাণীদের যে কাজটুকু আমরা নিষ্ঠুর বা নিকৃষ্ট অর্থে দেখি সেটা তারা টিকে থাকার জন্য করে এবং মানুষের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম বিবেক বুদ্ধি থাকার কারণে করে।

মানুষই একমাত্র বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে অধিক বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ আমরা অন্য প্রাণীদের করতে দেখি। পৃথিবীজুড়ে তার বহু উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু মানুষ এমন কিছু নিকৃষ্ট কাজ করে যা নিতান্তই খেয়ালের বশে, মোটেও বাধ্য হয়ে নয়। একজন মানুষ কি করতে পারে আর কি পারে না তা সম্পর্কে আমরা কোন ধারণাই করতে পারি না। মানুষের দ্বারা সব সম্ভব। সর্বোত্তম ভালো কাজও সম্ভব, নিকৃষ্টতম কাজও সম্ভব এই মানুষের দ্বারা।

পশুদের যে কাজকে আমরা নিকৃষ্ট অর্থে দেখি তার সবই মানুষের দ্বারাও হতে দেখি। আমি কখনো মানুষকে নেতিবাচক অর্থে পশু বলতে পারি না। কোন পশু, পাখি বা প্রাণীর নাম তুলে মানুষকে গালিও দেই না। কারণ তাতে পশুদের প্রতি অন্যায় করা হয়। মানুষের অন্যায় কাজের জন্য কেন ওদের অপবাদ দিব! মানুষের মন্দ কাজের দায়ভার মানুষকেই নিতে হবে। একটা খারাপ কাজের জন্য আমি মানুষকে মানুষের বাচ্চা বলেই গালি দিয়ে ফেলি!

তাছাড়া মেডিকেল এবং মনস্তত্ত্বের গবেষণা ও বিশ্লেষণে এখন আমরা এমন অনেক বিষয়ই জানতে পারি যা আপাত দৃষ্টিতে নেতিবাচক বা খারাপ দেখালেও ঐ কাজগুলো মানুষ হরমোনজনিত কারণেই করে থাকে। অর্থাৎ সে মানুষ বলেই অমন কাজ করে ফেলে, সেক্ষেত্রে ঐ মানুষটাকে আমরা আর নীতিগতভাবে বা মানবিকভাবে দোষ দিতে পারি না। উদাহরণ হিসেবে সমকামিতার কথা বলতে পারি। আগে ভাবতাম বিকৃত মস্তিষ্কের কারণেই মানুষ সমকামি হয়, জঘন্য ভাবতাম বিষয়টাকে। কিন্তু যখন থেকে জানি মানুষ ইচ্ছে করে সমকামি হয় না, এটা হরমোনাল কারণে হয় তখন আর সমকামিতাকে খারাপ চোখে দেখার অবকাশ নেই। এই সমকামিরাও মানুষ। কিন্তু যখন মানুষ হরমোনের কারণে নয় বরং বিকৃত রুচির কারণে এ ধরনের কাজ করে তখন তাদের আমরা খারাপ মানুষ বলতে বাধ্য।

এবার দেখি ‘মানুষ’ শব্দটাকে কেন আমরা ইতিবাচকই মনে করি। কারণ মান+হুশ=মানুষ। অর্থাৎ যে প্রাণীর মান এবং হুশ আছে তারাই মানুষ। অন্য কোন প্রাণীর কি মান ও হুশ নাই? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্য প্রাণীরাও মান এবং হুশ বজায় রাখে। মান এবং হুশ কেবলই মানুষের বৈশিষ্ট্য নয়। মানুষের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসহ মান এবং হুশ থাকলে সে মানুষজাতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কিন্তু ভালো মানুষ হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া ‘মান’ এবং ‘হুশ’ বিদ্যমান থাকলেই মানুষ ভালো কাজ করে তা কিন্তু নয়। মান ও হুশ নিয়ে মানুষ খারাপ কাজও করে। চোর যখন চুরি করে, ঘুষখোর যখন ঘুষ খায়, ধর্ষক যখন ধর্ষণ করে তখন কিন্তু সে মান-সম্মান বজায় রেখেই অর্থাৎ গোপনে লুকিয়ে ছুপিয়ে করে এবং নিজেকে বাঁচানোর যথেষ্ট হুশ নিয়েই করে।

আচ্ছা ধরুন দেখতে মানুষের মত আকৃতির কিন্তু তার মান বা হুশ নেই তাকে আপনি কি নামে ডাকবেন? যারা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, যাদের মান ও হুশ নেই তারা কি? তাদের মানুষ বলবেন না? কি অপরাধে তাকে অমানুষ বলবেন অথবা তাকে কি নামে ডাকবেন? প্রতিবন্ধী? জানোয়ার? নিশ্চয়ই না। প্রতিবন্ধী হওয়াতে তার তো কোন দোষ নেই! তাকে তো একটা জাতিগত নাম দিতে হবে। তার নামটাও মানুষ। আবার ধরুন একজন পাগল। তারও মান ও হুশ নেই। তাকে কি বলবেন? শুধুই পাগল? মানুষ না সে? সে কিন্তু ইচ্ছে করে পাগল হয়নি। তো মানুষ নামকরণ থেকে সে বাদ পড়বে কোন দোষে ? এই পাগল, প্রতিবন্ধী তো শত চেষ্টা করলেও মান ও হুশের উন্নয়ন ঘটিয়ে আভিধানিক অর্থের ইতিবাচক মানুষ হতে পারবে না!

বিষয় হচ্ছে ‘মানুষ হতে হবে’ এই কথাটা আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। কথাটা হওয়া উচিত ‘ভালো মানুষ হতে হবে’। কারণ মানুষ যত খারাপ কাজই করুক তা সে মানুষ বলেই করে। মানুষের মধ্যে সব ধরনের ভালো-মন্দ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। একজন মানুষ যখন একটা বাচ্চাকে ধর্ষণ করে তখন সে মানুষ হয়েই এটা করে। আবার যখন একজন মানুষ নিজের প্রান বিসর্জন দিয়ে আরেকটা প্রাণকে বাঁচায় তখনও সে মানুষ হয়েই সেটা করে। আসলে মানুষ কি করবে আর কি করবে না তার দিক নির্দেশনা কোথাও নেই। আমরা নীতিগতভাবে ধরে নেই এই কাজটা মানুষের করা উচিত, এই কাজটা করা উচিত নয়। এটা আমাদের প্রত্যাশা, বাধ্যতামূলক প্রাপ্তির বিষয় নয়।

হ্যাঁ, ধর্ম মানুষকে দিক নির্দেশনা দিয়েছে। ধর্ম যা যা বলেছে ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষেরা মনে করেন তাই সঠিক, তাই ভালো। আসলেও কি তাই? মোটেই না। মানুষের পথ চলায় ধর্মীয় নির্দেশনার যেমন কিছু ভালো দিক রয়েছে তেমনি অসংখ্য মন্দ বা অমানবিক দিকও রয়েছে। আমরা যারা সেসব অমানবিক বা মন্দ দিকগুলো বিবেচনা করতে পেরেছি তারা তথাকথিত ধর্মকে পাশে চেপে রেখে নিজেদের মত করে একটা ধর্ম বেছে নিয়েছি। যেটাকে সাধারণত মানবধর্ম বলে থাকি। এই মানবধর্মে মানুষ হওয়া যাবে না। হতে হবে ভালো মানুষ। আর ভালো মানুষ বলতে কি বোঝায় তা আমাদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই বুঝে নেয়। ভালো মানুষ আর মন্দ মানুষ বুঝতে আমাদের খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না।

অন্য প্রাণীর একটা প্রাণী থেকে একটা ভালো প্রাণী হওয়ার সুযোগ বা সুবিধা বা উপায় নেই। কিন্তু একজন মানুষ থেকে একজন ভালো মানুষ হওয়ার সুযোগ, সুবিধা এবং উপায় সবই মানুষের আছে। অন্য প্রাণী থেকে মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ মূলত এটাই। বিবেক, বুদ্ধি এবং জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে মানুষ থেকে ভালো মানুষ হতে হয়। আর এই বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞান চর্চার সুযোগ মানুষের রয়েছে, যা মানুষ ইচ্ছে করলেই পারে। তাই আসুন শুধু মানুষ নয়, ভালো মানুষ হই।

লেখক: সাংবাদিক ও তরুণ লেখক।

Comments

comments