সুত্রপাত / অনন্যা / মাদক শুধু সমস্যা নয়, একটি অভিশাপও
drag

মাদক শুধু সমস্যা নয়, একটি অভিশাপও

আরশি মারজান:
আমার এক খু-উ-ব ছোটবেলার বন্ধু, নাম তুর্য(ছদ্মনাম)। ও আমার নাম উচ্চারন করতে পারতনা। তাই বিকৃত শোনাত। এর জন্য কত যে ভৎসনা করেছিলাম ওকে! আমাকে ছাড়া ও এক পাও স্কুলে যেতনা, এমন কি খাওয়ার সময়ও আমাকে ওর পাশে বসে থাকতে হত। এখন যেমন জনসম্মুখে সাইকেল চালাই কিন্তু তখন কেন জানি সংকোচবোধ হত। তাই প্রতিদিন ওই আমাকে সাইকেলে চড়িয়ে স্কুল,প্রাইভেটে নিয়ে যেত আসত। স্কুল থেকে ফিরে খেলাধুলো, গাছে চড়া, দুষ্টুমি লেগেই থাকত আমাদের। মজার ব্যাপার হল ও গাছে উঠতে পারতনা। তাই আমি গাছে উঠে পেয়ারা, কামরাঙ্গা, আম পেরে দিতাম ও কুড়োতো। বয়ঃসন্ধির আগ পর্যন্ত খুব মজার একটা সময় কাটিয়েছি। বয়ঃসন্ধি উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, এরপর থেকে আমাদের আন্তরিকতায় একটা তফাৎ তৈরি হয়েছিল। হয়ত সেটা পরিবারের অনুশাসন, সমাজের কড়া দৃষ্টির জন্য। কারণ আমাদের সমাজ ছেলে-মেয়েদের বন্ধুত্বকে শুধু নির্মল চোখে দেখেনা, সেখানে কোন কুটিলতা না থাকলেও তারা আবিষ্কার করে নেয়। আমরা তখন নবম শ্রেণিতে পড়ছি। যদিও দুষ্টুমির পরিমাণ কমেছিল কিন্তু বন্ধুত্ব তখনো অটুট ছিল। ও একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে। সে তাকে নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছে এবং মেয়েটিও ওর সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে সম্মত। কিন্তু সমস্যা হলো তুর্যের মা।

তিনি ভীষণ রাগি মানুষ। জানতে পারলে ওর কপালে অনেক দুঃখ নেমে আসবে। এই ভেবে ও আমাকে জানালো সবটা। তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিলনা তাই আমাকেই ওর পিয়নের দায়িত্বটা নিতে হলো। বেশ দারুণ কাটছিল দিনগুলো কিন্তু পাল্টে যেতেও বেশি দিন লাগেনি। ওদের সম্পর্কটা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলোনা। কিছু অপ্রিতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে যবনিকা টেনেছিল আমার প্রিয় বন্ধুটার প্রথম প্রেম। কেন জানি এই বিষয়টা আমার কাছে ভাল লাগলনা। তখন থেকেই দুরুত্বটা আরো বারতে শুরু করল। আমি তখনো জানতামনা, আমার বন্ধু এক অজানা, অনিশ্চিত, ভয়াবহ, অভিশপ্ত জীবনের পথে পা বাড়িয়েছে! ওর এই পথচলা শুরু হয়েছিল সিগারেটের মাধ্যমে। কিন্তু আমার  চোখের সামনে ওকে কখনো ধূমপান করতে দেখিনি তাই বিশ্বাস হতোনা। এরপর শুনেছিলাম খুব অল্প সময়েই ওর পদোন্নতি হলো গাঁজাতে। তখন আর আমাদের মাঝে তেমন দেখা সাক্ষাতও হতোনা। এগুলো ছিল কানকথা। কিন্তু যেদিন শুনলাম অতিরিক্ত মদ্যপানের ধকল সইতে না পেরে ওর কচি কলিজাটায় পচন শুরু হয়েছে, সেদিন সইতে না পেরে ওকে ফোন করেছিলাম। (এতদিনে আমরা ফোন ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিলাম।) ও তখন হসপিটালে ভর্তি আছে। খুব আস্তে আমাকে হ্যালো বলল, আমার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি অতর্কিতে গড়িয়ে পড়ল।

আমি ইত:স্তত করে লাইনটা কেটে দিলাম। কথা বলতে ভয় হচ্ছিল, বারবার মনে হচ্ছিল ও বোধ হয় হারিয়েই যাচ্ছে আমাদের মধ্য থেকে। মাদক ওর জীবনটা সংকুচিত করে দিল। ও ছিল ক্লাসের মেধাবী ছাত্র, খেলাধুলোতেও অসামান্য পারদর্শী। ও মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরল কিন্তু হারিয়ে ফেলল একটা সুন্দর আগামিকে। বরাবর খারাপ রেজাল্টের জন্য ঊন্যুভার্সিটির ছাত্রত্ব বাতিল করা হল। ফিরে এল সে গ্রামে কিন্তু নেশা তার আজো পিছু ছাড়েনি। কোনোদিন ভাবিনি ওর নেশাগ্রহন আমার চোখে পড়বে! একদিন জানালায় বসে দূরে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ চোখে পড়ল, তুর্য সিগারেটের মধ্যে কিছু একটা ঢুকিয়ে সেটায় টান দিয়ে তার বিষাক্ততা প্রাণপনে গ্রহণ করে কুন্ডুলি পাকানো ধোঁয়া ছেড়ে দিল। এরপর সবার ইন্দ্রিয়কে ধোঁকা দিতে সে জুস দিয়ে কুলকুচি করে নিল। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে আছি। ও নেশাদ্রব্য গ্রহণ করছেনা যেন নেশাই ওকে গ্রহণ করছে! ও হারাচ্ছে ধীরে ধীরে নিজেকে, পরিবারকে, ভালবাসাকে, সমাজকে। প্রতিটা নেশাগ্রস্ত মানুষের কাছে উল্টোটা সত্যি, সত্যটা উল্টো। এই মানুষগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা ও অসহায় প্রাণি! কেন জানেন? যে এদের সুস্থ পথে চলার পরামর্শ দেবে সে খারাপ আর যে এক পুরি গাঁজা এনে দেবে সে দেবতা। এদেরকে সমাজ কোন দৃষ্টিতে দেখে? আদৌ কি দেখে! নাকি অবহেলা, ঘৃণায় তাকাতে ইচ্ছে করেনা কারো? ওর হাতে প্রথম কে তুলেদিয়েছিল নেশাদ্রব্য? হয়ত কোন প্রাণের বন্ধু! সেই বন্ধুর হাতে? সমাজের কোন অন্ধকার ঘুঁপচিতে ওৎ পেতে থাকে এসব কেউটেরা। সমাজই তাদের আশ্রয় দেয়, সমস্ত আপদের নির্ভয় দেয়। এরা সুযোগ পেলেই টেনে নেয় বন্ধু, ভাই, আপনজনদের।

এত এত আইন তৈরি হচ্ছে, মাদক বিরোধি সেমিনার সিম্পোজিয়াম হচ্ছে কিন্তু তারপরও কেন কমানো যাচ্ছেনা মাদকের ভয়াবহতা? উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, রাস্তাঘাট পাবলিক প্লেসে আজকাল পুরুষ লোকেরা যেভাবে নিঃসংকোচভাবে ধুমপান করে তাতে পৃথিবীর আয়নোস্ফেয়ার নিকোটিনের প্রভাবেই হয়ত কোনদিন ধসে পরবে! এরা নিজেদের তো নই আশপাশের অধূমপায়ী মানুষের কথাও ভাবেনা। শুধু আইন তৈরি করে কোন দেশের মানুষ কে সভ্য বানানো যায়না। সভ্য জাতি গড়ে তুলতে
হলে চাই সামাজিক আন্দোলন, নিজের পরিবর্তন, সচেতনতা। আজ আমার বন্ধুটার জীবন ধ্বংস করল মাদক অভিশাপ কাল হয়ত অন্য কোন পরিবারে নেমে আসবে এর ভয়াবহতা। আমাদের প্রসাশন শুধু খাতা কলমে মাদকাসক্তের হিসেব করে, তারা মাদক কারখানার হিসাব করে, মাদক ব্যবসায়ীদের হিসাব করে কিন্তু তারা কি কখনো ভেঙ্গে যাওয়া পরিবারগুলোর হিসাব রাখে? রাখেনা। প্রসাশনের দায়িত্বহীনতার জন্য দিনদিন এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে রমরমা ব্যবসা করছে। অথচ, সভ্য সমাজ নিশ্চুপ!

লেখক: অনলাইন এক্টিভিষ্ট।

Comments

comments

error: Content is protected !!