সুত্রপাত / ইতিহাসের পাতা / ভারতবর্ষে বাঙ্গালী বৌদ্ধদের রেঁনেসা (পর্ব-৩)
jitu

ভারতবর্ষে বাঙ্গালী বৌদ্ধদের রেঁনেসা (পর্ব-৩)

জিতু চৌধুরী:

সে সময় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন খুব জোরদার হয়ে চরম পর্যায়ে আসে । এই সময় বৃটিশ সরকার নতুন করে এক ভারত শাসন আইন প্রবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিলেন । তালতলা বাসভবনে কলকাতা ধর্মাঙ্কুর সভা, বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কতালা নিবাসী ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী, ড. বেনী মাধব বড়ুয়া, ডিষ্ট্রিকট রেজিষ্ট্রার বাবু অধর লাল বড়ুয়া, এডভোকেট ভূপেন্দ্র লাল মুৎসুদ্দি, ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট বাবু রেবতী রমন বড়ুয়া, ড. অরবিন্দ বড়ুয়া, ধর্মাদিত্য ধর্মাচারিয়া প্রমুখ নেতৃবৃন্দের বৈঠকে বৌদ্ধদের দাবি সম্বলিত এক “মেমোরেন্তাম” (স্মারক পত্র) রচনা করা হয় এবং বৃটিশ পার্লামেন্টের প্রত্যেক মন্ত্রী ও সদস্যগনের নিকট প্রেরন করেন, ইহার ফলে নতুন ১৯৩৫ সানের ভারত শাসন আইন নামে খ্যাত বঙ্গীয় সভায় বৌদ্ধদের একজন প্রতিনিধি গ্রহনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । প্রথমে ড. অরবিন্দ বড়ুয়া এবং দ্বিতীয় বার রায় বাহাদূর ধীরেন্দ্র লালা বড়ুয়া এম, এ, বি, এল মনোনয়ন লাভ করে সংখ্যা লঘুতম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার অধিকারী লাভ করেন ।

১৯৩৫ সালে ড. অরবিন্দ ভাষনে বলেন, ভারত শাসন আইনে বৌদ্ধদিগকে শাসন ব্যাপারে কোন স্বতন্ত্র অধিকার না দেওয়াতে তাঁহাদের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোন কাহারো সন্দেহ থাকিতে পারে না । সত্য বটে বাঙ্গালী বৌদ্ধদের সংখ্যা অতি অল্প কিন্তু তথাপি যদি ২,৮০০ এংলো ইন্ডিয়ানদের জন্য চারটি সদস্য পাইতে পারে, তাহলে ৩,৩০,০০০ বঙ্গীয় বৌদ্ধরা তাহাদের সংখ্যানুরুপ সদস্য কেন পাইবে না ? তাঁহাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা ও ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী বৌদ্ধরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল । সেই ভাষনে রাজেন্দ্র প্রসাদ, জহুরলাল নেহেরু, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ চন্দ্র বসু, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শেরে বাংলা ফজলুল হক প্রমুখ বিখ্যাত রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষক করতে সক্ষম হয়েছিল ।

ব্রক্ষদেশের স্বাধীনতা আন্দলনের বিদ্রোহী নেতা আরাকানের অধিবাসী ভিক্ষ উত্তমের সাথে তৎকালীন বৃটিশ সরকার কর্তৃক বহিস্কৃত হয়ে কলকাতাস্থ ব্রহমী বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করছিলেন । তিনি প্রায় সময় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরীর, চৌধূরী ডিসপেনসারীতে এসে ধর্ম ও সমাজ বিষয়ে আলোচনা করতেন । সর্ব ভারতীয় বিরাট রাজনৈতিক সংস্থা হিন্দু সভার সভাপতি পদে ১৯৩০-৪০ দশকের মধ্যে নির্বাচিত হন । বিহারের রাজধানী পাটনা নগরে বাৎসরীক অধিবেশনে সভাপতি উত্তমের সঙ্গে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী মহোদয় ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে যোগদান করেছিল । ভারতীয় বিরাট রাজনৈতিক সংস্থার সভাপতির পদ লাভ একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গৌরবের বিষয় এবং হিন্দু নেতৃবৃন্দের মহান উদারতার পরিচায়ক ।

নেপালী বংশোদ্ভব দার্জিলিংয়ের অধিবাসী অনাগারিক ধর্মাদিত্য ধর্মচারিয়া এম, এ মহোদয় অল ইন্ডিয়া বুড্ডিষ্ট কনফারেন্স নামে এক সমিতি গঠন করেন । বাংলা গর্ভনরের এডিকং সর্দ্দার বাহাদূর লাভেনলা সভাপতি ও তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক । প্রায় সময় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী সাথে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক আলাপ আলোচনা করতেন । শুনেছি, পরবর্তীকালে তিনি নেপালের গনতান্ত্রিক সরকার কৈরলা মন্ত্রী সভার সদস্য পদ লাভ করেছিলেন । উক্ত সময়ে বিশ্ব-বিখ্যাত ডব্লি ও, এফ, বির অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল । দানবীর অনাগারিক ধর্মপাল মহোদয়ের প্রতিষ্ঠিত মহাবোধি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন যুবক অনাগারিক বাবু দেবপ্রিয় বলিসিংহ প্রায় সময় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী সাথে ধর্ম, সমাজ ও সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতেন।। মহা দুঃখের বিষয় তিনি অকালে পরলোক গমন করেন ।

এদিকে কলকাতা ধর্মাঙ্কুর বিহারের নিরাপত্তার কথা ভেবে সভার সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী একটি রেজিষ্ট্রীকৃত এক ট্রাষ্ট্রি বোর্ড (Trustcc Boart) গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এক জরুরী সভার বৈঠকে সর্বসম্মতি ক্রমে ট্রাষ্ট্রি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । ১৯৩৫ সালে ১১ মে-তে ধর্মাঙ্কুর বিহারের যাবতীয় সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষনাবেক্ষনের জন্য ট্রাষ্ট্রি বোর্ড গঠন করা হয় । বোর্ডের সদ্যসগনের নাম যথাক্রমে-

১| প্রভুদয়াল হিম্মত সিনহা, জেনারেল ম্যানেজার বিরলা এন্ড কোং ।
২| সন্তোষ কুমার বসু, তৎকালীন মেয়র কলকাতা করপোরেশন ।
৩| ড. বেনী মাধব বড়ুয়া, অধ্যাপক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ।
৪| রেবতী রমন বড়ুয়া, ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট ।
৫| ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী, সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসেসিয়েশন ।

তথ্যঃ ডা শান্ত কুমার চৌধূরীর জীবনালেখ্য, ১৯৮১ সাল, ১১,১২,১৩ পৃষ্ঠা।

তথ্যঃ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক
সাংবাদিক ডি. পি. বড়ুয়া’র গ্রন্ত্র
বাঙ্গালী বৌদ্ধদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

তথ্যঃ জ্ঞানতাপস সমন পূন্নানন্দ স্বামী
ড. জিনবোধি ভিক্ষু
১৯৯৫ সাল।

বিদ্র: পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষা করার বিনীত অনুরোধ করছি ।

Comments

comments

error: Content is protected !!