সুত্রপাত / ইতিহাসের পাতা / ভারতবর্ষে বাঙ্গালী বৌদ্ধদের রেঁনেসা-(পর্ব-২)
jitu

ভারতবর্ষে বাঙ্গালী বৌদ্ধদের রেঁনেসা-(পর্ব-২)

জিতু চৌধুরী:
১৯৩০-৩১ সালের কার্য বিবরনীতে অন্যতম মূদ্রক ছিলেন ড. বেনী মাধব বড়ুয়া । কতালা নিবাসী ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক । ১৯৩৩ সালে ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী কলকাতা ধর্মাস্কুর বিহার সভার সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় এবং আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হয় বৌদ্ধ অনুশীলন সমাজ ও মহিলা সমিতি । এদিকে, সুষমা সেন গুপ্তার মামলা হাইকোটে ওঠলে । কলকাতা ধর্মাস্কুর বিহার সভার কর্মকর্তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন । এমতবস্থায় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী মহাত্মা দানবীর বিড়লাজির সাহায্য প্রার্থনা করতে মনস্থ করলেন, এই ব্যাপারে ড. বেনী মাধব বড়ুয়ার সাহার্য্য ও পরামর্শ একান্ত প্রয়োজন মনে করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করতে গেলেন । সঙ্গে ছিলেন সতীশ চন্দ্র বড়ুয়া মহোদয় । যথা-রীতি সৌজন্য প্রদর্শন করে ধর্মাস্কুরের দূরাবস্থার কথা বিবৃত করলেন এবং এই ব্যাপারে সাহার্য্য প্রার্থনা করলেন ।
উল্লেখ্য কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবিরের সহিত মতানৈক্যে ফলে ড. বেনী মাধব বড়ুয়া বিহার ও ধর্মাস্কুর সভা সংস্থার একেবারে সর্ম্পক ত্যাগ করে উপরন্ত কোন বৌদ্ধদের সাথে মেলামেশা ছিলনা । ধর্ম ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন (৭) । অতীতের এই মানসিক বেদনা ভাবাবেগে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সম্প্রদায়ের বিরদ্ধে কঠোর সমালোচনা শুরু করলেন । ইহাতে ডা: শান্ত কুমার চৌধূরীর বিবেকে আঘাত লাগলে তিনি ও তদূত্তরে কিছু কঠোর বাক্য প্রয়োগ করার ফলে উভয়ের মধ্যে তুমুল তর্ক যুদ্ধের সৃষ্টি হয় । অতঃপর তাঁহারা উভয়ে নিরাশ হয়ে অফিস কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন । ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী তাঁহার বিখ্যাত চৌধূরী ডিসপেনসারীতে এসে বিষন্নমনে এই অপ্রিকর ঘটনার কথা ভাবছেন । তখন সন্ধ্যা ৭ ঘটিকা । শহরের আলোক মালা জ্বলে উঠেছে । রাস্তায় লোকের গমনা গমনের ভীর । এই ভীরের মধ্যে ড. বেনী মাধব বড়ুয়া রাস্তা অতিক্রমের পদক্ষেপ নিলেন ডিসপেনসারী অভিমুখে । সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন, ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া (বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সহ. সভাপতি) । ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া বললেন ড. বেনী মাধব বড়ুয়া আসছেন (৮) ।
ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী বসার জন্য অনুরোধ করলেন । বগলে টুপি ধীরপদক্ষেপে ডিসপেনসারীতে প্রবেশ করলেন । ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া দাড়িয়ে প্রণাম করে অভ্যর্থনা জানালেন।। টুপিটি টেবিলের উপর রেখে বললেন ডা: শান্ত বাবু আমি দুঃখিত । আসন গ্রহন করে দৃঢ়কন্ঠে বললেন আমাকে কি করতে হবে বলুন । নাটকীয় ভাবে বিগত দুঃখ বেদনা ভুলে শান্তি ও সৌহার্দ্দপূর্ণ খোলা মনে উভয়ে ধর্মাস্কুরের সমস্যার ব্যাপারে আলোচনা আরম্ভ করলেন । চা পানের পর ড. বেনী মাধব বড়ুয়া আদেশ করলেন এক টুকরা কাগজ ও কলম নিয়ে তাহার সম্মুখে বসতে । ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া তাই করলেন । ড. বেনী মাধব বড়ুয়া বয়ান করে যাচ্ছেন আর ডা. রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া লিখছেন । দুইখানা আবেদন পত্রের ন্যায় চিঠি । একখানা আরাকানের বিখ্যাত ব্যবসায়ী বাবু ধীরেন্দ্র লাল চৌধূরী মহোদয়ের নিকট দ্বিতীয় খানা রামু নিবাসী মতিসিং মহাজনের নিকট প্রেরণ করতে বললেন । চিঠি দুই সম্পাদকের নামে প্রেরন করা হল । ধীরেন বাবু অক্ষমতা জানিয়ে উত্তর দিলেন, মতিসিং মহাজন কোন উত্তরই দিলেন না ।
সেই দিন থেকে রাত্রি ৭/৮ ঘটিকায় ভবানীপুর বাসায় যাওয়ার পথে প্রায় সময় ডিসপেনসারীতে উঠতেন এবং জটিল ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন । কয়েক কাপ চা ও সিগারেটের বহুি উৎসব করে বাসায় ফিরতেন । উভয় নেতার মধ্যে বন্ধুতা ও গভীর আন্তরিকতা গড়ে ওঠেছে । ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী, ড. বেনী মাধব বড়ুয়াকে অনুরোধ করলেন ধর্মাস্কুর বিহার সভা পরিদর্শনের জন্য । অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ড. বেনী মাধব বড়ুয়া ধর্মাস্কুর বিহারে গিয়ে উপস্থিত হলেন । এই সময় ধর্মাস্কুরের মূল মন্দিরের উপর তলায় ছিলেন মহামান্য ৮ম সংঘরাজ শীলালংকার মহাস্থবির । বহুদিন পর ধর্মাস্কুরে তাঁহার এই ক্ষণিকের আগমনটি ছিল ধর্মাস্কুরের উত্থান-পতনের ইতিহাস । সুষমা সেন গুপ্তার দায়ের কৃতি হাইকোর্টের মামলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কৌশলী নিয়োগ করলেন । কৌশলীর পরামর্শ অনুসারে একজন বিশিষ্ট বৌদ্ধ ভিক্ষুকে সাক্ষ দিতে হবে যে জমিটির উপর বৌদ্ধ ধর্মীয় “পবিত্র সীমা” প্রতিষ্ঠিত আছে । কোন মতেই উহা হস্তান্তর বন্ধক বা বিক্রি করার কারো অধিকার থাকতে পারে না ।
অতপর তাঁহারা দানবীর বিড়লা মহোদয়ের সাহার্য্য প্রার্থনা করলেন।। দানবীর তাঁহাদের অনুরোধ অনুমোদন করে ধর্মাস্কুর বিহারে পরিদর্শনে এলেন । উঠানের এক পাশে কিছু তাজা মাছের আঁশ দেখে বললেন, আপলোক নিরামিষ ভোজন নেহি করতে হে, তদূত্তরে ড. বেনী মাধব বড়ুয়া বললেন বৌদ্ধ ধর্মে আহারে কঠোর নিয়ম বিধি নাই । দানবীর বিড়লা ধর্মাস্কুর বিহারকে ঋন মুক্ত করে দিলেন, উপরন্ত খালি মাঠে আর্য বিহার নির্মান করে সদ্ধর্মের প্রভূত উন্নতি বিধান করলেন । এই মহৎ কার্য সম্পাদন করে বিড়লাজী বৌদ্ধ ধর্মের পরম হিতৈষীর পরিচয় প্রদান করলেন । ত্রিতল ভবনের ভিত্তি স্থাপনের সময় ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী ধর্মের ও সমাজের বৃহত্তর স্থার্থের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ হস্তে ভিক্ষু সীমার “পাথরের খুটি” উৎপাদন করেছিলেন । এর জন্যে কোন কোন লোকের বিরুদ্ধ সমালোচনার সম্মূখীন ও হয়েছিলেন । তাঁহার বিচক্ষন বুদ্ধিমত্তা ও কঠোর শ্রমের ফলে ড. বেনী মাধব বড়ুয়ার সহ-যোগিতা লাভ করে ধর্মাস্কুর বিহার ঋন মুক্ত হল এবং সম্পদ ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি হল । এর পর ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী তাঁহার স্বগ্রাম হতে বিনয়াচার্য বংশদীপ মহাস্থবিরকে কলিকাতায় আহবান করে ধর্মাস্কুর বিহারের বিহারাধ্যক্ষ পদে ও নালন্দা পালি বিদ্যা ভবনের অধক্ষের পদে নিযুক্ত করেন । এই নালন্দা বিদ্যা ভবনের প্রতিষ্ঠাতা লগ্নে আর্থিক ভাবে সাহার্য্য করেন ড. অরবিন্দ বড়ুয়া । তিনি ছিলেন নালন্দা বিদ্যা ভবনের একনিষ্ট পৃষ্টপোষক । এই নালন্দা বিদ্যা ভবনের অন্যতম অধক্ষ ছিলেন ড. বেনী মাধব বড়ুয়া । ড. বেনী মাধব বড়ুয়ার আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হয় নালন্দা বিদ্যা ভবন । তথ্যঃ জগজ্জ্যেতি, নবপর্য্যায় ২য়-৩য় সংখ্যা ৮ম বর্ষ ১৯৫৮ সাল ।
তথ্য: ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া।

Comments

comments

error: Content is protected !!