সুত্রপাত / অনন্যা / বয়:সন্ধির দোষ, সমাজের নির্বাক চাহনি

বয়:সন্ধির দোষ, সমাজের নির্বাক চাহনি

আরশি মারজান:

কতই বা বয়স মেয়েটার! হবে হয়ত তের-চৌদ্দ! ছেলেটাও কাছাকাছি বয়সের। হয়ত একি ক্লাসে পড়াশুনোর সুবাদে দুজনের পরিচয়। বন্ধুত্ব, কাছাকাছি আসা, তারপর প্রেম! এই বয়সটাতে প্রেমে পড়তে খুব একটা বেগ পেতে হয়না। কেননা এ সময় নিজের মনের উপর দখল খুব কম থাকে। চিন্তা ভাবনাগুলোও এলোমেলো থাকে। অস্তিরতা তাড়া করে বেড়ায় সারাক্ষণ। ভালোলাগার কোন বিষয় সহজে খুঁজে পাওয়া যায়না আবার একটুতেই অনেক খুশি দোলা দেয় প্রাণে ফের বিষন্নতা ছেঁয়ে ফেলতেও খুব একটা সময় লাগেনা। এই হলো বয়সন্ধিকাল! মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন প্রাণীর জীবনে বয়সন্ধি এত ঘটা করে আসে কিনা আমার জানা নেই। শিশুরা নিজেদের হঠাৎ আবিষ্কার করে কোন এক রঙ্গিন জগতে। তারা সব কিছু নিজেদের মত করে ভাবতে শুরু করে। বড়দের উপদেশ অসহ্য লাগে, নীতি কথা শুনতে ভাল লাগেনা, কারো দেয়া সিদ্ধান্ত বোঝার মত মনে হয়। আসলে সে নিজেও বোঝেনা কি হচ্ছে তার সাথে!

কেন মনে হচ্ছে তার, তার ভাল কেউ চায়না! সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যোগ্যতা পেয়ে গেছে! মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে? মনের উপর জোড় থাকেনা বলে মন বেচারাও খামখেয়ালি করতে পিছুপা হয় না। বর্ষাকালও ধরা দেয় বসন্তরুপে। ভীজে বাতাস মুহূর্ত্বের মধ্যে ফাগুনের উদাসী হাওয়ায় রুপান্তরিত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উদাস দুপুরে। সে বোঝেনা তার মন কি চায়! সে ভাবে এইত সময় কারো হাতে হাত রাখার, স্বপ্ন দেখার, তেপান্তরে হারিয়ে যাওয়ার! ঠিক ভুলটা তখনি হয়! মন বেচারা কে মিছামিছি দোষ দিয়ে লাভ নেই! সবতো করছে ঐ মগজ ব্যাটার ডিব্বায় লুকিয়ে থাকা পিটুইটারি গ্লান্ড! মানব শিশুকে পরিপূর্ণ করে তুলতে বেচারি সারা দিন রাত রস(হরমোন) ছাড়ছে! আর মনটা থেকে থেকে সেই বার্তাই বহন করছে স্নায়ু থেকে মানব কোষে! তাহলে যখন ভুলটা ঘটে যায় তখন দায়টা কার থাকে? চৌদ্দ বছরের সেই শিশুটার নাকি সমাজ ব্যবস্থার?

পরিবার নাকি  পরিবেশের? পরিবার হয়ত ঠিকভাবে শিশুটির পথনির্দেশনা দিতে অক্ষম ছিল! আর পরিবেশ নিশ্চয় শিশুর মেধা বিকাশের প্রতিকূলে ছিল! আমি শিশুটিকে দোষ দেই না। আমি তাদের করা ভুলের জন্য আমাদের সমাজ আর পারিবারিক ব্যবস্থাকে দায়ি করি। কেননা শিশুটি বেড়ে উঠছে কোন এক পরিবারে আর সেই পরিবারটাকে চালনা করছে কোন এক সমাজ ব্যাবস্থা। যখন ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশুদের করা ভুলের অনৈতিক ভিডিও ফুটেজ আপনি দেখেন তখন আপনার কি মনে হয়? এমনি একটা ভিডিও ক’দিন আগে আমার চোখে পড়েছিল। আমি ভিডিও দৃশ্যটা দেখে শেষ করতে পারিনি। কারণ তার আগেই আমার চোখের পাতা ভিজে গিয়েছিল। মনটা ভীষণ রকম ভারি হয়ে উঠেছিল। বারবার মনে হচ্ছিলো আমার আমাদের কি কিছুই করার নেই!

আমরা বিলীন হয়ে যাচ্ছি অনৈতিকতার রোষানলে! আমরা আদৌ কি তা টের পাচ্ছি? তারপর মনে হলো আমার আদরের সন্তান গুলোর কথা। ভিডিও দৃশ্যে সেই কিশোরীর মলীন অসহায় মুখ সেই কিশোরের ক্ষ্যাপা পাশবিক পুরুষালী চেহারা আমাকে আজো ব্যথিত করছে! হয়ত এমন অনেকে আছে যারা এই দৃশ্যটাকে আরো বিস্তৃত পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে লাইক করতে কার্পণ্য করবেনা! শিশুদের অনৈতিক মেলামেশা, ভিডিও দৃশ্য ধারণ করা তারপর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া। এসব তারা কোথায় শেখে? নিশ্চয় সমাজে পূর্বে ঘটে যাওয়া প্রাপ্ত বয়স্কদের ঘটনা থেকে তারা শিক্ষা পায়! যে সমাজে আমরা বাস করছি সেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী যখন এমন ভুল কাজ ঘটিয়ে থাকে আমি তখন পরিবারকে দোষ দেই না। সমাজ কেও না। কারণ সমাজ পরিবর্তনের দায়ভার এক প্রজন্মের পর আর এক প্রজন্মের হাতে এসে পরে। একটা অসুস্থ সমাজ ব্যাবস্থা যখন পূর্বপ্রজন্ম রেখে যায় তখন অনৈতিকার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। বর্তমান প্রজন্মের সমাজ সংস্কারের  দায়িত্বটা বেড়ে যায়। কিন্তু ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।

অনেকে বলে সমাজ পরিবর্তন করা খুব কঠিন। আসলে কি তাই? খারাপ বিষয়গুলো যত দ্রুত ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়ে ভাল বিষয়গুলো যদি এভাবে ছড়িয়ে দেয়া যায় আপনার কি মনে হয় একটা অসুস্থ সমাজ কে সুস্থ সমাজে পরিবর্তিত করতে খুব বেশি সময় লাগবে! আমাদের ইচ্ছা শক্তির প্রয়োজন, প্রয়োজন সুস্থ মানসিকতার। কোন ভুল বা কোন অন্যায় করার আগে আমাদের ভাবতে হবে  পরের সারির কথা। তারা আপনাকে দেখে শিখছে বা শিখবে। এই বোধ যখন কারো মনে জাগ্রত হবে তখন মনে হয় না সমাজে অন্যায় ঠেকাতে আমাদের আর আইনের প্রয়োজন হবে!

লেখক: নারী অধিকার আন্দোলন কর্মী।

Comments

comments