সুত্রপাত / ধর্ম ও দর্শন / বৌদ্ধ ধর্ম ও রাহুল সাংকৃত্যায়ন
jitu

বৌদ্ধ ধর্ম ও রাহুল সাংকৃত্যায়ন

জিতু বড়ুয়া:

রাহুল সংকৃত্যায়ন (১৮৯৩-১৯৬৩) সংস্কৃত বিদ্যাসেবি রণশীল সম্ভ্রান্ত ব্রাক্ষন পরিবারে ১৮৯৩ সালে ৯ এপ্রিল ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার পানহা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহন করেন । নাম রাখা হয় কেদারনাথ পান্ডে । রাহুলের বাবার নাম গোবর্ধন ও মাতার নাম কুলবন্তী । রাহুলের মাতা মাত্র ২৮ বছর বয়সে মারা যান । অনাথ কেদারনাথকে লালন পালন করেন স্নেহময়ী মাতামহী । রাহুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আরম্ভ হয় মাদ্রাসায় ১৮৯৮ সালে । মাদ্রাসাতে রাহুল উর্দু ভাষা রপ্ত করেন । ১৯০৭ সালে স্কুল পালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন । সেই থেকে রাহুলের ভ্রমনের নেশা পেয়ে বসে । ১৯১০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রথাসিদ্ধ জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সাধু জীবন বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করেন । তিনি একজন প্রগতিশীল লেখক । সংস্কৃতি ও পালি বিদ্যাচর্চা ছিল তার প্রধান বিষয় । স্বশিক্ষিত মহাপন্ডিত রাহুল বহু বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেছিল । সাহিত্য রচনা ও ভ্রমণর অনুসঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন তীর্থ, বিহার, ঐতিহাসিক স্থান ও দেশ পরিভ্রমণ করেছেন আর লিখেছেন হিন্দী, সংস্কৃত, পালি, ইংরেজী, ভোঁজপুরী এবং তিব্বতি এ ছয়টি ভাষায় । এক কথায় রাহুল সংকৃত্যায়ন ছিলেন ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক গগণে প্রতিভাময় এক উজ্জল নক্ষত্র ।

১৯১৩ সালে পারাসা মঠ ত্যাগ করে করে দক্ষিন ভারতের আসানসোল, আদ্রা, খড়গপুর, পুরী, মাদ্রাজ, তিরুমালাই ভ্রমন করেন । এই সময় তিনি তামিল ভাষা শিখেন । ১৯১৫ সালে তার অন্তর্জীবনের বৈদান্তিক পর্ব শেষ করে আর্য সমাজী প্রচারকদের সংঙ্গে যুক্ত হন । ১৯১৫ সালে কেদারনাথ আগ্রায় আর্য মুসাফির বিদ্যালয়ে ভর্তি হন । এই সময় কেদারনাথ ভেকধারী সাধুদের গোড়ামি এবং তারা কিভাবে গৃহস্তদের প্রতারণা করে তার মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য আগ্রার উর্দু পত্রিকা “মুসাফির” এবং মীরাটের হিন্দী পত্রিকা ভাস্কর এ প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন । ১৯১৬ সালে আর্য সমাজীদের শক্ত ঘাঁটি লাহোরে যান । ১৯১৯ সালে লাহোর সামরিক আইন জারী কেদারনাথের মনে গভীর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটায় । তখন রাহুল তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তাঁর মনের প্রতিক্রিয়া জানাতে লাগলেন । মঠ কিংবা আর্য সমাজীদের সঙ্গে তাঁর সকল সর্ম্পক ছিন্ন করে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন সর্ম্পকে লেখাপড়া করতে লাগলেন। ১৯২৩ সালে রাহুল বুদ্ধের প্রথম ধর্ম প্রচার স্থথান সারনাথ, বুদ্ধের নির্বাণভূমি কুশীনগর, জন্মস্থান লুম্বিনী প্রভৃতি বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলো দর্শন করেন । এরপর একে একে কপিলাবস্তু সাবস্তী, রাজগীর, নালন্দা ভ্রমন করেন । নেপাল ভ্রমনের সময় বহুসংখ্যকক বৌদ্ধ মনীষী ভিক্ষুর সংঙ্গের সংস্পর্শে আসেন । ১৯২৭ সালে শীলংকার বিহারে সংস্কৃত অধ্যাপক পদে যোগদান করেন এবং বৌদ্ধ ধর্ম চর্চ্চায় আরো ব্যাপপক মনোনিবেশ করেন । দেড় বছরের মধ্যে রাহুল ত্রিপিটকের ৪০ খন্ড পালি ভাষায় অধ্যায়ন করে এবং ত্রিপিটককাচার্য উপাধি পান । ১৯৩০ সারে দ্বিতীয়বার সিংহলে যান, তখন তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন ২৮ জুন, ১৯৩০ সাল । নিজেই নতুন নাম রাখলেন রাহুল সংককৃত্যায়ন । রাহুল চার বার তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে গবেষণা (১৯২৯,১৯৩৪,১৯৩৬ ও ১৯৩৮) করেন ।

তিব্বত থেকে বৌদ্ধ মনীষী নাগাজুন, বসুবন্ধু, প্রজ্ঞাকর প্রমুখের অতি মূল্যবান পুঁথি, পুস্তকাদি, পান্ডলিপি সংগ্রহ করে আনেন । ১৯২৮ সালে অসহযোগ আন্দলনে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । জনমত সংঘটিত করার কারনে ১৯২২ সালে কারাবন্দি হন । একই সাথে জেলা কাংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন । ১৯৩৯ সালে রাহুল কমিউনিষ্ট পাটির সদ্যস পদ লাভ করেন । রাহুলের প্রথম সাহিত্য জীবনে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়কে প্রথম গ্রন্ত্র বুদ্ধচর্চা । এটি ১৯২৯ সালে প্রথম তিব্বত যাত্রার পর ১৯৩০ সালে সালে শ্রীলংকায় গ্রন্ত্রটি রচনা করেন । এছাড়া ও অনেক বই পুস্তক রচনা করেছেন । ১৯৬১ সালে ভারত সরকার “পদ্মভূষণ” উপাধি দিয়ে এই মহামনীষীর মেধা এবং অবদানের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন । ১৯৬৩ সালের ১৪ এপ্রিল মহাপরিব্রাজক, মহাপন্ডিত রাহুল সংকৃত্যায়ন মৃত্যু বরন করেন ।

তথ্য: ড. জগন্নাত বড়ুয়া
সহকারী অধ্যাপক, পালি বিভাগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
১৩৯,১৪০,১৪১,১৪২,১৪৩ পৃষ্ঠা

তথ্য: অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া
মিরসরাই কলেজ
অর্থনীতি বিভাগ
১৪৬,১৪৭,১৪৮ পৃষ্ঠা

প্রাচীন পুঁথিপত্র ও পান্ডুলিপি সংগ্রহ সত্যানুসন্ধ্যানী, জ্ঞানপিপাসু রাহুল সাংকৃত্যায়ন গভীর বৌদ্ধবিদ্যা পুনরুদ্ধারে উৎসক ও অনুসন্ধিৎসায় চারবার তিব্বত গমন করে মোট তিন বৎসর অবস্থান করেন । আর এস শর্মা উল্লেখ করেছেন, রাহুল নেপাল ও তিব্বত থেকে প্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাস, সভ্যতা, ঐতিহ্য, ধর্মদর্শন ও বাংলা সাহিত্যের চর্যা নিদর্শনের দুষ্প্রাপ্য মহামূল্যবান জেলাগ্রাফ, পান্ডুলিপি ৩৬৮ টি বৌদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্ত্রের পান্ডুলিপি এবং তালপাতা ও কাঠের খুদাই পুঁথিপত্র সংগ্রহ করেন । এছাড়া তিনি ৬১৯ টি পান্ডুলিপি তিব্বত ভাষায় এবং কিছু অনুবাদ সংস্কৃত ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করেন । তাছাড়া রাহুল ৫৫ টি প্রাচীন পুঁথির আলোকচিত্র সংগ্রহ করেন । তিনি ১৫০ টি থ্যাংকা (চিত্রপট) ও ৮০ টি মূল্যবান মিশ্রসংস্কৃত ভাষার বৌদ্ধ গ্রন্ত্রের পান্ডলিপি ক্রয় করেছিলেন । বৌদ্ধ মহাযান ও বজ্রযানী দেবদেবীর ১৩০ টি কাপড়ে আকা ছবি সংগ্রহ করেন ।

তথ্য: ড. জগন্নাত বড়ুয়া
সহকারী অধ্যাপক, পালি বিভাগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
১৪৪ পৃষ্ঠা

রাহুল সংস্কৃত্যায়নের মতে, ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের বিলোপ সাধন ত্রয়োদশ চতুদর্শ শতকে আরম্ভ হলে ও তার কারণ গড়ে উঠেছে বহুকাল আগে থেকে । বৈশালীর দ্বিতীয় সঙ্গীতির পর থেকে বৌদ্ধ ধর্মে বহু মতবাদের সৃষ্টি হওয়ায় অনুসারীরা বহু দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে । কনিষ্কের আমল থেকে মূর্তি গড়া আরম্ভ হয় । বুদ্ধ বোধিসত্ত্বকে মানব সত্ত্বারূপে না মেনে দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হল । বুদ্ধ বোধিসত্ত্বের জীবনদর্শনের সাধনা ছেড়ে দেবতা জ্ঞানে পূজার্চনা শুরু হয় । তাছাড়া, অসংখ্য দেব দেবতার সৃষ্টি করে অন্যান্য ধর্মের উপাস্য দেব দেবতার সংখ্যা অতিক্রম করে ফেলল । জীবন দুঃখের অবসান ঘটাবার উদ্দেশ্যে বুদ্ধ প্রদর্শিত সাধন মার্গ পরিত্যাগ পূর্বক পূজার্চনার নানা বিধি আবিস্কার করল এবং মহা ধুমধামে পূজার্চনা আরম্ভ হয়ে গেল । বোধিজ্ঞান, নির্বাণ মুক্তি কঠোর সাধন সাপেক্ষ রইল না । পূর্জার্চনার মাধ্যমে নির্বাণ মুক্তি সুলভ, সহজ সরল বলে বিবেচিত হল । মহযান ও তন্ত্রযান বৌদ্ধ ধর্মে ধারণী, চক্র সংবর এবং তৎসম্পর্কিত ইত্যাদি তপ-জপ ও তন্ত্র-মন্ত্রের প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছাল, যার বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃত সত্ত্বা, বৈশিষ্ট্য ও মৌলিক আদর্শ উৎপাটিত হয়ে বৈদিক ধর্মের পুনর্জাগরনের বিরাট সহায়তা করল । বৌদ্ধ ধর্মের মূল আদর্শ ধরে রাখার মহান ব্যক্তিত্বের অবসান ঘটল । এভাবে ধর্মের বিলোপ সাধিত হল ।

তথ্য: ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান পতন
মহাপন্ডিত রাহুল সংকৃত্যায়ণ
১২ পৃষ্ঠা

রাহুলের লেখাই চমৎকার ভাবে ফুটে উটেছে বৌদ্ধ ধর্ম কিভাবে বিকৃতি হয়েছে । এতে কারো কোন সন্দেহ থাকিতে পারে না । এই ব্যাপারে আমি ও আর কিছুই বলতে চাই না ।

Comments

comments

error: Content is protected !!