সুত্রপাত / গবেষণা / বৌদ্ধ ধর্ম ও অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া
jitu

বৌদ্ধ ধর্ম ও অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া

জিতু বড়ুয়া:

চট্টগ্রাম জেলা পটিয়া উপজেলার একটি সমৃদ্ধ জনপদ কেলিশহর ইউনিয়নস্থ উত্তরভূর্ষি-ছররপিটুয়া গ্রাম । বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম, শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্প-বানিজ্যে পটিয়ার রয়েছে জোড়া খ্যাতি । চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের ঘাঁটি হিসাবে সুপরিচিত ছিল এই পটিয়া । গুর্খা সৈন্যরা তাড়া করে বেড়াত বিদ্রোহীদের । এই সৈন্যরাই পটিয়া উপজেলার গৈরলা গ্রাম থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাষ্টার দা সূর্যসেনকে গ্রেফতার করেন ১৯৩০ সালে । ১৮৫০ সালে এ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন কীর্তিমান পুরুষ নীলকমল বড়ুয়া । তিনি জুনিয়ার এন্ট্রান্স পাশ করে বৃটিশ পুলিশ বাহিনীতে এস. আই (দারোগা) পদে যোগদান করে রাঙ্গামাটি কালেক্টোরেতে কর্তব্যরত ছিলেন । তিন পুত্র ও এক কন্যা (সুভাষিনী) সন্তানের জনক ছিলেন । পুত্রগন ছিল পূর্নাচার, বীরেন্দ্রলাল, সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া । বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের আলোদাতা ও সমাজ সংস্কারক দ্বিতীয় সংঘরাজ পূর্ণাচার ধর্মধারী চন্দ্রমোহন মহাস্থবিরের অন্যতম শিষ্য, কলকাতা ধর্মাঙ্কুর বিহার সহ ভারতবর্ষে বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে প্রতিষ্ঠাতা, বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সদ্ধর্ম উন্নয়নের অগ্রদূত কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবিরের তদীয় প্রথম শিষ্য, অধ্যাপক সমন পূর্ণানন্দ স্বামী ।

অধ্যাপক সমন পুর্ণানন্দ স্বামী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভি.সি. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শে ১৯১২ সালে পালি অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন । নীলকমল দারোগার তৃতীয় পুত্র অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া ১৯১৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি বিভাগে ভর্ত্তি হন । তখন তাঁর অগ্রজ সমন পূর্ণানন্দ স্বামী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার সুবাধে অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া বিদগ্ধজনের মধ্যে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিকট রাজনৈতিক দীক্ষা নিয়ে ভারতীয় কংগ্রেস পাঠিতে যোগদান করেন । সেই সময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর তাঁর প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন এবং কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন । অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া ১৯২০ সালে পালিতে এম. এ পাশ করে স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত হন । সেই সময় গান্ধীজী ১৯২১ সালে আন্দোলনের ডাক দিলে অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ ও সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে কলকাতায় রাজপথ থেকে সাময়িকভাবে কারান্তরীন হন । তৎপর তিনি কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশে কলকাতা ন্যাশনাল কলেজে পালি অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন । এর পর সুরেন্দ্রনাথকে সোদপুর গান্ধী আশ্রমে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন ।

পরে সেখান থেকে তাঁকে আকিয়াব কংগ্রেস পাটিকে সুসংগঠিত করার জন্য এবং ন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রেরণ করেন । বৃটিশরাজ পরিবার বেশ কয়েক বছর স্কুলটি চালানোর পর দেশদ্রোহিতার শিক্ষনের অভিযোগে স্কুলটি বন্ধ করে দিলে তিনি স্বপরিবারে কোলকাতায় চলে আসেন । এই সময় অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া ধর্মাঙ্কুরে বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (১৯২৫-১৯২৬) সভাপতি হিসাবে ছিলেন তাঁর ভ্রাতা সমন পূর্ণানন্দ স্বামী । ন্যাশনাল স্কুল, কলেজ নামে, কংগ্রেস পাটি ভারতে বিভিন্ন স্থানে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, কংগ্রেস হাই কমান্ডের নির্দেশেই তিনি ঢাকায় গিয়ে গৌপীরাগ স্থানে ন্যাশানাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এর অধ্যক্ষ হন । তিন বছর চলার পর বৃট্রিশরাজ ঐ একই অজুহাতে অথাৎ দেশদ্রোহিতা শিক্ষণের অভিযোগে কলেজটি (১৯৩০-১৯৩৩) বন্ধ করে দেন । তৎপর অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া চট্টগ্রামে চলে আসেন । অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া চট্টগ্রাম কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত ১৯৩০ সালে । ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন । এবার অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া কতালা নিবাসী, বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী’র প্রতিষ্ঠিত কতালা-বেলখাইন মহাবোধি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হন ।

আর্দশ ও উন্নত মানের স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী বৌদ্ধ নেতা, মহান শিক্ষাবিধ, চট্টগ্রাম কংগ্রেসের সভাপতি অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়াকে তাঁহার নিজ বাড়ীতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন । স্কুল পরিচালনার ভার মাষ্টার অতিন্দ্র লাল চৌধূরী দায়িত্বে অর্পন করে ডা: শান্ত কুমার চৌধূরী কলকাতায় প্রত্যাবর্ত্তন করেন । অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া অহিংসা বাদের পূজারী আজীবন খদ্দর পরিহিত কংগ্রেস ওয়াকিং কমিটির সদস্য ছিলেন । যাহার ফলে কতালা-বেলখাইন গ্রাম শিক্ষা সংস্কৃতিতে প্রথম শ্রেনীর অন্যতম বৌদ্ধ গ্রামে পরিনত হতে সক্ষম হয়েছিল । অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া এবার ” ন্যাশানাল শব্দটি ব্যবহার করলেন না । কারণ ন্যাশানাল শব্দটির গন্ধ পেলেই বৃট্রিশরাজ ক্ষুব্দ হয়ে ওঠেন এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন । এদিকে কানুগোপাড়ার বোয়ালখালী থানার ডেপুটি রেবতী রন্জ্ঞন দত্ত মহোদয় তথায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহন করেন এবং অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়াকে অনুরোধ করেন এ ব্যাপারে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য । সুরেন্দ্রনাথ কানুনগোপাড়া কলেজ পালি বিভাগ এবং বুড্ডিষ্ট হোষ্টেল প্রতিষ্ঠার শর্তে সর্বপ্রকার সহযোগিতার জন্য অঙ্গীকার করেন ।

সুরেন্দ্রনাথ অন্যান্য সহযোযোগীদের নিয়ে মধ্য চট্টগ্রাম ঘুরে ঘুরে ৩০ জন হিন্দু, ১৫ জন মুসলিম, এবং ৫ জন বৌদ্ধ সর্বমোট ৫০ জন ছাত্র নিয়ে ১৯৩৯ সালে কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজের যাত্রা শুরু করেন । পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং বহুছাত্র যোগ হয় । প্রথমে এম. এন রায় নামে কলকাতার এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের অধ্যক্ষপদে যোগদান করার কথা ছিল । কথা ছিল বিভিন্ন বিভাগের বহু অধ্যাপকের যোগদান করার, এম এন রায় আর এলেন না । ভাগ্যলক্ষী এম এল মাগের দিকে ঝুকে পড়ল ডেপুটি সাহেব মাখন লাল নাথ মহোদয়কে অধ্যক্ষপদে নিয়োগ দিলেন । প্রথম দিকে সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া পালি এবং সংস্কৃতি উভয় বিভাগে ক্লাস নিতেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন । বুড্ডিষ্ট হোষ্টেল ও প্রতিষ্টা হল । ২০ জন ছাত্র এই হোষ্টেলে থাকতে পারতো । কলেজে অবস্থান কালে অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সংবিধান রচনা করেন এবং এই সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে পরিগণিত হন । কর্মযোগী বিশুদ্ধানন্দ মহাথের ছিলেন তাঁর অত্যন্ত আপন জন । ১৯৪৬ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু মাস দুয়েকের ব্যবধানে পন্ডিত জহুরলাল নেহুর পটিয়ায় জনসভা করতে আসেন । এই দুই নেতাকে অভ্যর্থনা জানান অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া । ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে গান্ধীজী আসেন নোয়াখালীতে । তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে চৌমুহনী রেল স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়ুয়া । ১৯৫৫ সালের ১০ জুলাই কলেজ ভাবনে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়ুয়া সকাল ৮টায় পরলোক গমন করেন ।

তথ্য: যুগোত্তম
অধ্যাপক দোর্দণ্ড প্রতাপ বড়ুয়া
২০১৫ সাল
১৫৫, ১৫৬, ১৫৭ পৃষ্ঠা

তথ্য: ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়ার লিখিত ভাষন
বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সহ: সভাপতি
১৯৮৫ সাল
৪ ও ৫ পৃষ্ঠা।

Comments

comments

error: Content is protected !!