Awlad

বেনু মাসী

আওলাদ হোসেন রনি:
এই ব্যবসাটা প্রাচীন। বনেদি ব্যাবসা। রমরমা কিন্তু অপ্রকাশ্য। জমজমাট কিন্তু অনালোচ্য। আলোচনা হলেও ভিতরে ভিতরে। একদম গভীরে, যার আওয়াজ বক্তা এবং শ্রোতা ছাড়া আর কারো কানে যায় না। এ লাইনে বেনু মাসীর বয়স কতোদিন হলো সেটা এখন বেনু মাসীর নিজেরই মনে নেই। বেনু মাসী প্রতিষ্ঠিত সর্দার, অপ্রতিদ্বন্দী নেতা, একচেটিয়া ব্যাবসায়ী। বেনু মাসীর হাত দিয়ে কতোজন এলোগেলো। রাঘব বোয়াল থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি; বেনু মাসী সবাইকে নরম মাখনের মতো নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তা সে হোক ভোগ্য অথবা ভোক্তা। বেনু মাসীর আজকের এই সুদর্শন, সুশৃঙ্খল সামাজ্যের পেছনে তার আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতাই মূল কারণ। আর দশজন ভদ্র সমাজবাদীদের চোখে এ কাজ গর্হিত হলেও বেনু মাসীর কাছে এটা ব্যাবসা। আর ব্যবসা- ব্যাবসাই। কই! তারা যে ওষুধ,বই, মানুষের জীবন নিয়ে ব্যাবসা করে সে তো কিছু বলে না। তার ওপর ওদের এতো রাগ কেনো? তাকে উৎখাত করলেই বোধ হয় সমাজের সংস্কার ষোলকলা পূর্ণ হয়! সবাই বাচ্চা রাম মোহন!

বেনু মাসী নিজেই তার আসল নামটা ভুলে গেছে। বর্তমান নামটি তার স্বপ্রদত্ত। আসল নামটি মনে পড়ে কালে ভদ্রে। তার আসল নাম ছিল বিনোদা রাণী রায়। নিজের অজান্তেই সে আবিষ্কার করলো যে সে বেনু মাসী। নামের পাশে ‘মাসী’ উপাধিটি কীভাবে যুক্ত হলো সে-ও এক রহস্য! এই নামটি ছেলে-মেয়েরা আদর করে রেখেছে। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাসী-পিসি সম্পর্কটা আলাদা একটা রসায়ন তৈরি করে। মাসী-পিসি হলে মাসীরও লাভ, ভাইপোরও লাভ। এটা একটা কারণ হতে পারে অথবা কৃষ্ণের সম্পর্ক যেহেতু তার মামীর সাথে হয়েছিলো- এটাও হতে পারে। তবে আপাত সত্য হলো বিনোদা রাণী রায় পেশার স্বার্থে বেনু মাসী। এ লাইনে বেনু মাসীর হাতে খড়ি হয়েছিলো তার স্বামীর অছিলায়। তার স্বামী পরিক্ষীত রায় দেখতে অনেকটা ষাড়ের মতোই ছিলো। আর ছিলো ভীষণ মদ্যপ। সেই সাথে জুয়ারী। তবে তার জুয়ার ভাগ্য ছিলো বেজায় মন্দ। কোনোদিন সে জিতে বাড়ি ফিরতে পারে নি। তবুও অন্তত একদিন জিতে ফেরার আশায় প্রতিদিন সে খেলেছে। তখন বেনু মাসীর ভরা যৌবন।

দেখতে শুনতে বেনু মাসী শুধু ভালোই ছিলেন না, বেশ লোভনীয়ও ছিলেন। ফলে পরীক্ষিত রায়ের খেলার সাথীরা হয়ে গেলো পরীক্ষিত রায়ের পাওনাদার এবং হঠাৎ একদিন বেনু মাসীর শরীরেরও ভাগীদার। বেনু মাসী মোটেও না করেন নি বরং বহুগামীতার বিষয়টিকে তিনি উপভোগ করেছেন এবং দেখেছেন- নাহ্, জীবন তো মন্দ নয়! বিষয়টা বেশ ভালোই লাগেতার। সেই থেকে শুরু। বেনু মাসী প্রথমেই বিষয়টুকো বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে নেন নি। প্রথমে তিনি নিয়েছিলেন স্বামী সেবার কর্তব্য হিসেবে। স্বামীর মান বাঁচাতে এতটুকো তো করতেই পারেন। এটা তো আর দোষের কিছু না! বরং তিনি শরীরটাকে বাড়তি একটু উপভোগ করতেন। কিন্ত সমস্যা দেখা দেয় যখন ‘ওভারডোজ’ হয়ে যায়। এবং ওভারডোজ হওয়ার প্রক্রিয়াটিও ছিলো সহজ। এমন দুর্লভ শরীরের সহজ প্রাপ্তিতে পরীক্ষিত রায়ে পাওনাদারের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। ফলে এক পর্যায়ে যখন মাত্রাতিরক্তই নিয়মিত মাত্রা হতে থাকে তখন বেনু মাসী বিষয়টিকে অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেন।

তখন বেনু মাসী ছিলেন গ্রামীণ শহরে। খবরটি রাষ্ট্র হতে খুব বেশী সময় লাগে না। এমনিতেই বেনু মাসীর স্বামী নৈমত্তিক ঘটনাটিকে সহজভাবে নিতে পারছিলেন না। শত হলেও নিজের স্ত্রী তো। যখন তার নিজস্ব সম্পদটির জন্য তিনি নিজে আব্দার করেন তখন তার জন্য অবশিষ্ট কিছু থাকে না। যদিও সম্পদটি শেষ হবার নয় তবুও, শরীর তো, ক্লান্তি লাগে। যখন স্বামী-স্ত্রী যৌথ সিদ্ধান্তে একমত হলেন যে তারা আপাতত এ শহর ত্যাগ করবেন তখন হঠাৎ এক রাতে পরীক্ষিত রায় ঘরে এলেন অসুস্থ্য হয়ে। তখনও মাসীর উপর একজন শুয়ে। বিরক্ত হয়ে তিনি উঠে গেলেন। পরিক্ষীত রায় কোনমেত বিছানার উপর উঠলেন, শুলেন, অতঃপর পরদিন শশ্মানে তার চিতা উঠলো। এর কিছুদিন পরেই বেনু মাসীকে দেখা গেলো এ পাড়ার একটি কামরায়। তার কামিনী দেহের উষ্ণতায় কিছু দিনের মধ্যেই সেই ঘরটিই তার নিজের ঘর হলো এবং ঈশ্বরের কৃপায় আজ এ পাড়ায় তিনি রাণী। অসহায়দের সহায়, অন্নহীনের অন্নদাতা, কামদেবের একান্ত সেবাদাসী।

বেনু মাসীর খদ্দেরদের প্রতি খুব খেয়াল। তিনি খুব ভালোমতোই জানেন খদ্দেররা শুধু শরীরই চায় না, শরীরের সাথে বাড়তি কিছুও চায়। সে মতোই তিনি ঘরটিকে তৈরী করেছিলেন। প্রথমত পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা, ঘরের মেঝে থেকে গণিকার চোখ পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত সঙ্গীত। হাল ফ্যাশনের সঙ্গীত নয়, খেতাবী ধ্রুব সঙ্গীত। ঘরের চারদেয়ালে মুগ্ধ চিত্রকলা। আর গণিকা বাছাইয়ের বেলায় যদিও সবধরনেই গ্রহনযোগ্য তবুও ভরাট, পুরুষ্ট, রসালো নারীদেরই তিনি তালিকার প্রথম দিকে রাখেন। গ্রাহকের রুচি অনুযায়ী সুরার ব্যবস্থাও আছে। সেই সাথে খুব সুক্ষ্মভাবে মোঘল আমলের কিছু শব্দ তিনি কথায় বার্তায় ব্যবহার করেন। এক কথায় সব কিছু তিনি করেন খুব হিসেব করে, পরিকল্পনা করে। একটা সুক্ষ্ম রুচি তিনি সবখানেই ছড়িয়ে রেখেছেন তার বলয়ে। বেনু মাসীর খদ্দের তালিকাটিও বেশ দীর্ঘ, সম্পূর্ণ। ক্লাস টেনে পড়ুয়া খোকা থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব বুড়া, চোর-ছ্যাচড় থেকে শুরু করে থানার বড়ো দারোগা, ভোটার থেকে শুরু করে ‘অমুক ঘরের’ সদস্য পর্যন্ত- সবাই আছে তার লিস্টে। প্রয়োজনমত সবার জৈবিক চাহিদা পূরণের গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন তিনি তার লঘু কাঁধে।

খুব সফলভাবেই সে দায়িত্ব পালনে সফল তিনি। সবার রুচি অনুযায়ী এমন কি কারো কারো বাসায় পর্যন্তও ‘মাল’ পৌঁছেন দেন। যার যেমন চাহিদা- হলিউডি, বলিউডি, পাকিস্তানি, গ্রাম্য-শহুরে, সব।তার নিজের রাজ্যের যারা প্রজা-খাতক সবার অসুখ-অসুবিধা তিনি দেখেন নিজের মনে করে। কখনো বজ্রের মতো কড়া হাতে, কখনো মোমের মতো কোমল মনে। কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করেন না তিনি। সম্ভবত সে কারণেই গত দশ বছর ধরে অপ্রতীদ্বন্দী হয়ে টিকে আছেন তিনি রাণীর আসনে। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও কারো কারো সাথে শয্যায় যান। তবে তার পছন্দের তালিকায় থাকে উঠতি যৌবনের ছেলেরা। এবং অতি অবশ্যই তিনি শুতে যান ফ্রি তে। যার ভাগ্য ভালো তাকেই তিনি দান করেন সাধের যৌবন। বলা যেতে পারে, এমনি করেই সুখে-শান্তিতে দিন কেটে যাচ্ছিলো বেনু মাসীর। কিন্তু না, বেনু মাসীর একান্ত নিজস্ব একটি দু:খ আছে। যা কেউ জানে না। তার একান্ত নিজস্ব আপনজনেরাও বেনু মাসীর সে দু:খের খবর জানে না। মাঝে মাঝে গভীর রাতে, ব্যস্ত মাসী যখন রঙিন পৃথিবী থেকে অবসর নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন অন্ধকারের কাছে, তখন খুব গোপনে অনন্ত লম্বা একটি দীর্ঘশ্বাস বেনু মাসীর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে। বাহারি সাপের মতো ক্রমাগত দংশন করে বেনু মাসীকে।

তার চল্লিশোর্ধ্ব জীবনকে। দু:খটি হলো তিনভুবনে আপন বলতে তার কেউ নেই। চারদিকে এতো এতো সঙ্গী সাথী রেখেও তিনি একা। তিনি কারো মা নন, কারো বোন নন, কারো কন্যা নন- তিনি কারো কিছুই নন। কেউ তার কিছুই নয়। তিনি সবার মাসী। যাকে শ্রদ্ধা করা যায় না, ভালোবাসা যায় না, বিশ্বাস করা যায় না। যার সাথে শুধু শোয়া যায়, শুয়োরের মতো ব্যবহার করা যায়, উপুড় করা যায়, চিৎ করা যায়। হোক, এমনই হোক। এই সভ্য সমাজের মুখে লাথি মেরে বেনু মাসী! কে কেমন সভ্য তা অন্ধকারে গেলেই টের পাওয়া যায়। তবুও মাঝে মাঝে বেনু মাসীর মনে হয়- কী ক্ষতি হাে বেনু মাসীর একটা সন্তান থাকলে? অন্তত বেঁচে থাকার ভিন্ন একটা মানে হতো তখন! মাঝে মাঝে মনে হয় তার একটা পাতানো সন্তান থাক, অন্তত যে কোনো একটা আত্মীয় থাক। না, থাকবে না। দরকার নেই, অভিনয় করবে না বেনু মাসী।বেনু মাসী এই সব সমস্ত জাগতিক সম্পর্কের উর্ধ্বে। জগতের মা আছে, বাপ আছে, কন্যা আছে, পুত্র আছে। জগতের আইন আছে, জগতের ধর্ম আছে, রাষ্ট্র আছে। তার কেউ নেই, সে স্বয়ম্ভর। তিনি মাসী, জগতের মাসী।

লেখক: ছাত্র ইউনিয়ন নেতা, নেত্রকোনা। 

Comments

comments

error: Content is protected !!