সুত্রপাত / রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা / বামের বাম ব্যবচ্ছেদ (পর্ব- ১)

বামের বাম ব্যবচ্ছেদ (পর্ব- ১)

নীল জোনাকিঃ

একটি ভৌগলিক অঞ্চল ও তৎসংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগনকে নিয়ন্ত্রন করার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে উঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে উক্ত ভৌগলিক অঞ্চলের জনগনকে শাসনের জন্য নিয়ম কানুন তৈরি করা। এই নিয়ম কানুনকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলা হয়।

পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই বিভিন্ন পদ্ধতির রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত। পরিচিত ও আলোচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো হচ্ছে- গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, অলিখিত পরিবার তন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র। আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে- ইসলামী শাসন ব্যবস্থা। উল্লেখিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবগুলো পদ্ধতিই বিভিন্ন দেশ বা রাষ্ট্রে প্রচলিত, শুধুমাত্র সমাজতন্ত্র ব্যতীত। যদিও সমাজতন্ত্রী তথা বামপন্থীরা বেশকিছু দেশকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করে থাকেন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। আদতে সে সব দেশ বা রষ্ট্রে সমাজতন্ত্রের নাম নিশানাও কোন কালে ছিল না। সেখানে যা ছিল এক কথায় তাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বলা যায়। শুধুমাত্র মৌখিক শ্লোগানই যদি সমাজতন্ত্র প্রয়োগের মাপকাঠি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

মার্ক্স, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সেতুং ছাড়াও টিটো, ক্যাস্ট্রো, ও চে গুয়েভারাকেই সমাজতন্ত্রের ধারক- বাহক ধরা হয়ে থাকে। আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া, চীন, উঃ কোরিয়া কিউবা ও ভিয়েতনামকে বলা হয়ে থাকে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি ভ ই লেনিনের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে, জার সম্রাটদের হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সমাজতন্ত্র কায়েমের মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্য দূর ও শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার রক্ষার শ্লোগান নিয়ে। ক্ষমতা দখলের পর নানাবিধ কারনে তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে পরবর্তী নির্বাচনে জনগন কতৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা হতে ছিটকে পড়েন। অর্থাৎ, লেনিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়েও রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। শ্রেণী বৈষম্য দূর, ও গণ মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন রাশিয়ার জনগনকে, তা স্বপ্নই রয়ে গেছে।

লেনিনের পরই আসে স্ট্যালিনের নাম। স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর সমাজতন্ত্রের বিধান। কিন্তু স্ট্যালিন স্পষ্টভাবেই পেশীশক্তির জোরে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠ ছিলেন। ক্ষমতায় টিকে থাকা ও নিজের জন্য নিরাপদ বুহ্য তৈরির লক্ষ্যে রাশিয়ায় গণহত্যার নারকীয় ইতিহাস রচনা করেছিলেন তিনি। সে ইতিহাস আমাদের সমাজতন্ত্রীরা সযতনে চেপে যান। সমাজতন্ত্রে কোন এলিট শ্রেণি থাকেনা, কোন একনায়কের স্থান সমাজতন্ত্রে না থাকলেও স্ট্যালিন নিজেকে এলিট শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত করে একনায়কতন্ত্র বহাল রেখেছিলেন সুদীর্ঘকাল ব্যাপী। সমাজতন্ত্র মানেই সমবায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। বাস্তুহারাদের জন্য লঙ্গরখানা ব্যতীত রাশিয়ার কোথাও এধরনের সমাজ ব্যবস্থা কোন কালে ছিল না। তাহলে রাশিয়াকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলার সুযোগ কোথায়?

লেনিনের বক্তব্য অনুযায়ী পুঁজিবাদই সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ ধাপ। অর্থনীতির ভাষায় মুক্তবাজার অর্থনীতিই হচ্ছে পুঁজিবাদ। বহুকাল পূর্ব হতেই চীনে চলছে মুক্তবাজার অর্থনীতি, যার ধারাবাহিকতায় অজস্র শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে ব্যক্তিমালিকানায়, বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিশ্বের নামীদামী পুঁজিবাদী ও জায়ান্ট কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে। তাহলে চীনে সমাজতন্ত্রের অস্তিত্ব কোথায়? উঃ কোরিয়াও নাকি সমাজতান্ত্রিক দেশ! আমিতো দেখি উঃ কোরিয়া একটি বড় আকারের কারাগার বৈ অন্যকিছু নয়। সেখানে জনগনের কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। টেলিফোন বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে রয়েছে নানা রকমের কড়াকড়ি, ইন্টারনেট তো এক প্রকার নিষিদ্ধ। ২৪ ঘন্টাই রেডিও চালু রেখে সুপ্রিম লিডার কিম জং উনের গুণকির্তন শুনতে হয় জনগনকে, কেউ রেডিও বন্ধ করলে তার বিরুদ্ধে রয়েছে শাস্তির বিধান। কিম জং উন সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলের পুত্র। এখানে সমাজতন্ত্রের নিয়ম অমান্য করে রাজপরিবারতন্ত্র বহাল করা হয়েছে। উঃ কোরিয়ার জিডিপি ৪৫ বিলিয়ন ডলার, অপরদিকে দঃ কোরিয়ার জিডিপি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। দঃ কোরিয়া বিশ্বের উন্নত, আধুনিক ও শিক্ষিত জাতির মধ্যে একটি অন্যদিকে তথাকথিত সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী উত্তর কোরিয়ার মানুষ পশ্চাৎপদ জাতির উদাহরণ।

(চলবে)

শেয়ার করুন
  • 6
    Shares

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!