সুত্রপাত / ব্যক্তিত্ব / বাংলার প্রথম বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অক্ষয়কুমার দত্ত
অক্ষয়কুমার দত্ত

বাংলার প্রথম বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অক্ষয়কুমার দত্ত

শিপ্ত বড়ুয়াঃ

অনেকদিন ধরেই ভাবছি অক্ষয়কুমার দত্তকে নিয়ে কিছু একটা লেখা যায় কিনা। খোঁজে খোঁজে অক্ষয়কুমারকে আরো কাছ থেকে চেনার চেষ্টা চালাচ্ছি। বাংলার বিজ্ঞান চিন্তায় যে মানুষটির নাম আজীবন রয়ে যাবে তিনিই অক্ষয়কুমার। নিচে যা লিখেছি তা নিছক আমার পড়া কয়েকটি বইয়ের হুবুহু লাইন। অক্ষয়কুমার এমন একজন মানুষ যাকে কোন বাঙালি লেখকের সাথে তুলনা করা মানানসই নয়। প্রথম বিজ্ঞানমনষ্ক মানে বুঝতেই পরেন তিনি কতোটা স্বশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। নিচে অক্ষয়কুমারের শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, ভাবধারা এবং প্রকাশনা নিয়ে কিছু  লেখার চেষ্টা করেছি ।

মূলত অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় নবদ্বীপের কাছে চুপী গ্রামে পীতাম্বর দত্ত এবং দয়াময়ী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র অক্ষয়কুমার জন্মগ্রহণ করেন এবং প্রখ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন তাঁর নাতি।

শিক্ষাজীবন

কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র থাকাকালে তিনি পঞ্চম শ্রেণি থেকে ডাবল প্রমোশন পেয়ে তৃতীয় (বর্তমান সপ্তম) শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। দ্বিতীয় শ্রেণি পরীক্ষা পাস করার পরই (১৮৩৫) পারিবারিক রীতি অনুসারে তাঁর বিয়ে হয়। কিছুদিন পরে পীতাম্বর দত্তের মৃত্যু হলে অক্ষয়কুমার দত্তের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র থাকাকালেই তিনি সেখানকার শিক্ষক হার্ডম্যান জেফ্রয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বহুভাষাবিদ পন্ডিত জেফ্রয়ের কাছে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, ফরাসি ও হিব্রু ভাষা ছাড়াও শিখেন পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, সাধারণ বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। আমিরউদ্দীন মুন্সির কাছে শিখেন ফারসি ও আরবি।

কর্মজীবন

অক্ষয়কুমার সংবাদপত্রে লেখালেখির মাধ্যমে লেখক জীবন শুরু করেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন; তিনি মূলত ইংরেজি সংবাদপত্রের প্রবন্ধগুলি বাংলায় অনুবাদ করতেন। ১৮৩৯ সালে তিনি তত্ত্ববোধিনী সভার অন্যতম সভ্য মনোনীত হন এবং কিছুদিন সভার সহ-সম্পাদকও ছিলেন। ১৮৪০ সালে তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৮৪২ সালে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যাদর্শন নামের একটি মাসিক পত্রিকা চালু করেন। কিন্ত এই পত্রিকা বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। লেখক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভের কারণে ১৮৪৩ সালে তাঁকে ব্রাহ্মসমাজ ও তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদকের পদে মনোনীত করা হয়। তিনি ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলেন। এই পত্রিকায় অক্ষয়কুমারের প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। প্রবন্ধগুলিতে সমসাময়িক জীবন ও সমাজ সম্পর্কে অক্ষয়কুমারের নির্ভীক মতামত (জমিদারি প্রথা, নীলচাষ, ইত্যাদি সম্পর্কিত মতামত) প্রকাশ পেত। এই সব প্রবন্ধ তিনি পরে বই হিসাবে বার করতেন। তাঁর প্রথম বই ভূগোল (১৮৪১) তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার পড়াশোনার জন্য তত্ত্ববোধিনী সভার উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল । দীর্ঘদিন পরে তাঁর দ্বিতীয় বই বাহ্যবস্তুর সহিত মানব-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার ১ম ভাগ ১৮৫২ সালে বের হয়। এরপর এই বইয়ের ২য় ভাগ, চারুপাঠ (তিনভাগ), ধর্মনীতি, ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায় (দুই ভাগ), ইত্যাদি বই প্রকাশিত হয় । চারুপাঠ শিশুপাঠ্য বই হিসেবে একসময় জনপ্রিয় ছিল।

১৮৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার কাশীপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘সমাজোন্নতিবিধায়িনী সুহূৎসমিতি’র প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিরোধ প্রভৃতি সমাজসংস্কারমূলক কাজে এ সমিতি উদ্যোগী হয়েছিল। অক্ষয়কুমারের অনেক রচনা ইংরেজি থেকে অনূদিত ও সংকলিত।।

চিন্তা ও চেতনা

প্রাচীন পাঠক্রম বদলিয়ে তিনি যুগোপযোগী নতুন পাঠক্রম চালু করতে চেয়েছেন। তিনি শিশুর জন্ম থেকে বিশ-বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাকে তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথমপর্ব শুরু হবে একটি বিশেষ শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে- যেখানে শিশুরা দু থেকে ছয় বছর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করবে। দ্বিতীয়পর্বের শিক্ষা হবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে- যেখানে ছয়-সাত থেকে চৌদ্দ-পনের বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা হবে। তৃতীয়পর্ব পনের-ষোল থেকে বিশ-বাইশ বছর পর্যন্ত। এটাকে তিনি উচ্চশিক্ষা বলেছেন। তিনি মেধাবী ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য এ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এর প্রসারের জন্য তিনি নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক দান করেন।

অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন; কিন্তু ধর্ম ব্যাপারে তিনি নিস্পৃহ ছিলেন। ব্রাহ্মসমাজে বেদকে ঈশ্বরের সৃষ্টি বলে মনে করা হয়, কিন্তু অক্ষয়কুমার দত্ত তা মানতেন না। ১৮৫১ সালের ২৩ জানুয়ারি ব্রাহ্মহ্মসমাজে একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, বেদ ঈশ্বরপ্রত্যাদিষ্ট নয়, বিশ্ববেদান্তই প্রকৃত বেদান্ত, অর্থাৎ ‘অখিল সংসারই আমাদের ধর্মশাস্ত্র। বিশুদ্ধ জ্ঞানই আমাদের আচার্য’ (The whole world is our scripture and pure rationalism is our teacher)। এছাড়া সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ভাষায় উপাসনা হওয়া উচিত বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন, ১৮৫৩ সালে খিদিরপুরের ব্রাহ্মসমাজ তা গ্রহণও করেছিল। পরে অবশ্য অক্ষয়কুমার দত্ত ঈশ্বর-উপাসনা বা প্রার্থনা বিষয়টিকেই অগ্রাহ্য করেন। তিনি বীজগণিতের সূত্রের মাধ্যমে দেখিয়ে দেন যে, মানুষের বাসনা পূরণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা নিষ্প্রয়োজন।

অক্ষয়কুমারের গ্রন্থ

অক্ষয়কুমার দত্তের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ছিলো (প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্র যাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার), (ভূগোল (১৮৪১)), (বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার (১ম ভাগ ১৮৫২; দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৩), (চারুপাঠ (১ম ভাগ ১৮৫২, ২য় ভাগ- ১৮৫৪, ৩য় খণ্ড- ১৮৫৯), (ধর্মনীতি (১৮৫৫), (পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬), (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় (১ম ভাগ- ১৮৭০, ২য় ভাগ- ১৮৮৩)। ভূগোল বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক বই এবং এ বইয়ের মাধ্যমে অক্ষয়কুমার দত্ত বাংলা যতিচিহ্নের প্রবর্তন করেন। পদার্থবিদ্যা পরে প্রকাশিত হলেও, এটি বাংলা ভাষায় রচিত বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রথম গ্রন্থ।

মৃত্যু

বালিগ্রামে ‘বোটানিক গার্ডেন’ নামের বাড়িতে তিনি শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। ১৮৮৬ সালের ১৮ মে মারা যান।

তথ্যসূত্রঃ

(সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; দ্বিতীয় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা: ১, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৩৫৪-৬।) (বাংলা সাহিত্যের কথা, সুকুমার সেন। সপ্তম সংস্করণ। পৃ. ১৯৩), (গ্রন্থপঞ্জি মহেন্দ্রনাথ রায়, শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার দত্তের জীবন-বৃত্তান্ত, কলকাতা, সংস্কৃত যন্ত্র) (উনিশ শতকের বাংলায় ধর্ম ও সমাজচিন্তা, কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানি ২০০৭)।

শেয়ার করুন
  • 188
    Shares

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!