সুত্রপাত / ধর্ম ও দর্শন / বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

আবু মুসা হাসান:

সাম্প্রদায়িকতা আমাদেরকে কোনদিন নাগাল পায়নি। এমনকি সাম্প্রদায়িকতার ছোবল যে এতো ভয়ংকর হয় তাও ছোটবেলায় অনুভব করিনি। ভারত বিভাগের প্রাক্কালে কোলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ভয়ংকর কাহিনী মায়ের কাছ থেকে শুনছি। কচি মনে ঐসব ভয়ংকর দাঙ্গার কবলে পড়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির করুন ও বীভৎস কাহিনী শোনে আঁৎকে উঠতাম। বড় হয়ে শুনেছি যে বৃটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে আসার প্রাক্কালে ভারত বিভাগের প্রবক্তারা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধিয়ে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করেছিল। পাকিস্তান হওয়ার পরও স্বার্থান্বেষী মহল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধিয়ে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। স্কুলে পড়ার সময় ১৯৬৪ সালে ঢাকায় ঐরকম একটি দাঙ্গা বাঁধার উপμম হলে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম।

মায়ের কাছ থেকে শোনা বৃটিশ আমলে কোলকাতার দাঙ্গা বা আমার দেখা ঢাকার দাঙ্গার পোস্টমর্টেম করার জন্য আমি এই লেখা লিখছিনা, লিখছি গত কিছুদিন আগে ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর দেখে হতবাক হয়ে। তবে হিন্দু কমিউনিটির সদস্যদের ওপর এবং তাদের বাড়ী-ঘরে এই জঘণ্য হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও এই জঘণ্য ঘটনার পোস্টমর্টেম করা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু লিখছি এই কারনে যে, এই ধরনের সাম্প্রদায়িকতার সাথে আমরা পরিচিত ছিলাম না, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি সাম্পদায়িক সম্প্রীতি।

আমরা ছয় ভাই-বোন এবং বড় খালার ছেলেরা যখন মা-খালাদের মাসী বলে ডাকতাম, তখন আশপাশের মানুষ ভাবত আমরা বোধ হয় হিন্দু। এই মাসী ডাকার একটা ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। তা হলো, আমার নানা ত্রীপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় স্কুল শিক্ষক ছিলেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগরতলায়ই থাকতেন। আমার বড় আপার জন্ম হয়েছিল আগরতলায় নানার বাড়ীতে এবং শৈশব কাটিয়েছিল ঐ আগরতলাতেই। তাই ঐ পরিবেশে বড় আপা আমাদের ছয় খালাকে মাসী বলেই ডাকতে শিখেছেন। বড় আপাকে অনুকরণ করে আমরা বাকী পাঁচ ভাই- বোন এবং আমার বড় খালার পাঁচ ছেলেও মাসী ডাকতে শিখেছে। আমার দুই খালা এখনও বেঁচে আছেন এবং তাদের দুজনকে যথারীতি ‘সখিনা মাসী‘ এবং ‘রুবী মাসী‘ বলেই সম্বোধন করি। তবে এই মাসী ডাকার পেছনে একটা সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও পারিপার্শ্বিক কারন রয়েছে। যেমন আমার সেজো খালার বড় ছেলে-মেয়েদের শৈশব কেটেছে নানান গ্রামের বাড়ী গঙ্গাসাগরের নিকটবর্তী টনকী গ্রামে। তাই ওরা ‘খালাম্মা‘ ডাকতে শিখেছে। আবার যে সব খালাতো-ভাইবোনরা ঢাকায় শৈশব কাটিয়েছে তারা ডাকছে ‘আন্টি‘। সে যাই হোক, এই বৃতান্ত লেখার কারন হচ্ছে যে, খালাদের মাসী বলে সম্মোধন করতে আমাদের এখনও কোন অসুবিধা হয়না, বরং স্বাচ্ছন্দই

বোধ করি। আমার স্ত্রী ও ভাবীরাও খালা শাশুড়ীদের মাসী বলেই ডাকে। ছোট বেলা থেকেই দেখেছি আমার ছোট মামা এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর পরিচালক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আজিজুল্লাহ চকলেট এর সাথে আখাউরার শংকর নাথ সাহার অটুট বন্ধুত্ব ছিল। শংকর নাথ সাহা ইনফর্মেশন সার্ভিসে যোগদান করে এনবিআর এর কর্মরত ছিলেন। দুজনেই এখন প্রয়াত। শংকর নাথ সাহাকে আমরা আপন মামা হিসেবেই গণ্য করতাম। ছোটবেলায় আখাউড়ায় শংকর মামার বাড়ীতেও বেড়াতে গিয়েছি। শংকর মামার মায়ের কাছ থেকে নানীর আদরই পেয়েছি। ছোট মামার সুখে-দুঃখে, মুক্তিযুদ্ধে কিংবা স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শংকর মামাকে তার পাশেই দেখেছি। ঢাকায় আমাদের নানী মারা যাওয়ার পর ট্রাকে করে লাশ গ্রামের বাড়ী নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের সাথে শংকর মামাও ছিলেন।

এবার আসা যাক মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সাম্প্রদায়িক সম্পৃতীর কথায়। আগেই বলেছি নানা আগরতলায় শিক্ষকতা করতেন। আমার মেঝো মামা প্রয়াত গোলাম রফিক আগরতলাতেই বড় হয়েছিলেন। আমি এবং আমার এক খালাতো ভাই মহিউদ্দিন আহমদ রফি মামার সাথেই আগরতলায় গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য। আগরতলায় যেয়ে আমরা বটতলায় নানার ছাত্র ধীরেন দত্তের বাসায় উঠেছিলাম। ধীরেন দত্তের ভাই বীরেন দত্ত ঐ সময় সিপিএম খেকে নির্বাচিত লোকসভার সদস্য। আমাদের সাথে নানী, মামী এবং দুই মামাতো ভাই- বোনও ছিল। দত্ত পারিবারের সবাই আমাদের সবাইকে খুবই আদর যতড়ব করে রেখেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং চলাকালে আমাদের স্কোয়াডে ছিল মানব কুমার গেস্বামী মানিক। জয়দেবপুরের কৃষকনেতা মনীন্দ্রনাথ গোস্বামীর ছোট ছেলে মানিক। ট্রেনিং ক্যাম্পে আমার সাথে সরল সোজা মানিকের খুব সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পর মানিক এসে আমাকে বললো যে, ও ওর মায়ের কাছে আমার অনেক গল্প করেছে। ওর মা আমাকে দেখতে চায়। তাই আমি আমার এক বন্ধু ফারুক সহ জয়দেবপুরে মানিকদের গ্রামের বাড়ী বেড়াতে গেলাম। আমি ও ফারুক দুজনেই মহসিন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। দুজনই ছাত্র ইউনিয়নের সμিয় কর্মী ছিলাম এবং একই রুমে থাকতাম। হৈ-চৈ করে কয়েকদিন মানিকদের বাড়ীতে বেড়িয়ে ঢাকায় ফিরলাম।

ঐবছরই সার্বজনীন দূর্গা পূজার সময় মানিকে মা আবার তলব করলেন। মাসিমার ঐ অনুরোধ উপেক্ষা করার উপায় ছিলনা। বন্ধু ফারুকসহ চলে গেলাম জয়দেবপুরে। চারদিন থাকলাম মানিকদের পরিবারের সদস্যের মতোই। অভিভূত হয়ে দেখলাম, ঐ এলাকার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই গোস্বামী বাড়ীর সার্বজনীন দুর্গাৎসবে অংশ নিয়েছিল। ছাত্রজীবনের পর কর্মজীবনেও হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ অনুভব করিনি। সংবাদে ষ্টাফ রিপোর্টার হিসিবে কাজ করার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের সহকর্মীদের কখনও আলাদা করে দেখিনি বা আলাদা করে দেখার কথা কখনও ভাবিনি। আমাদের সময়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল তা নতুন প্রজন্মকে উপলব্ধি করার জন্য আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। একসাথে দিনের পর দিন ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে এসাইনমেন্ট কভার করতে গিয়ে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার সুভাষ চন্দ বাদলের সাথে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। ঐ সময় গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হতো। কাজ শেষ করে রাত ১টা/২টায় বাড়ী ফিরতে হতো। ঐ সময় আমরা ছোট দুই ছেলে-মেয়ে সহ আমার মা-বাবার সাথে মুহাম্মদপুরে থাকতাম। বাদল একদিন বললো, তুমিতো খালাম্মা-খালুর সাথে থাক। গভীর রাতে বাড়ী ফিরলে ভাবীর কোন অসুবিধা হয়না। কিন্তু আমি বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকায় থাকব কি করে, আমার বউ এতো রাত পর্যন্ত একা একা থাকবে কি করে? চলো, আমরা দু‘জনে মিলে একটা বড় বাড়ী ভাড়া করি। তাহলে রাতে আমার ফিরতে দেরী হলেও আমার বউ ভাবী আর খালাম্মা-খালুর সাথে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।

বাদলের এই প্রস্তাবে আমার স্ত্রী এবং মা-বাবা সম্মত হলো। মালিবাগে বড় ফ্লাট নিলাম। এরপর বাদলের বউ পছন্দের পালা শুরু হলো। বিয়ে ঠিক হলো জামালপুরে। বিয়ে উপলক্ষে আমরা চারদিনের জন্য বাদলদের গ্রামের বাড়ী ষরিষাবাড়ীতে গেলাম। উৎসবমুখর পরিবেশে বিয়ের সব আনুষ্ঠানকিতায় যোগদান শেষে বাদলের মা-বাবা ও ভাইবোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ঢাকায় ফিলে এলাম। কয়েকদিন পর বাদল বৌদিকে নিয়ে ফিরে এলো। পুরনো ঢাকায় স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাদল আমাদের সাথেই ছিল। আমরা এই দুই পরিবার শুধু একবাড়ী নয়, এক রানড়বা ঘরও ব্যবহার করেছি। এতে করে কিন্তু আমার আত্মীয় স্বজন এবং শশুর পক্ষের কোন আত্মীয় স্বজনদের কোন অসুবিধা হয়নি। এমনকি বাদলের আত্মীয়-স্বজনদেরও অসুবিধা হয়নি, বাদলের ভাইবোনরা এসে বেড়িয়েছে।

কিন্তু, এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির বাংলাদেশে নাছিরনগরের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে কেন? আগেই বলেছি যে, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় দাঙ্গা বাঁধার উপμম হয়েছিল। উপμম নয়, দাঙ্গাই বেঁধেছিল। আরও পরিস্কার ভাবে বলতে গেলে পাকিন্তানী শাসকগোষ্ঠী আদমজী জুট মিলের অবাঙালী শ্রমিকদের মাধ্যমে এই দাঙ্গা শুরু করিয়েছিল তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। কিন্তু তখনতো বাংলাদেশের সর্বস্তরের শান্তিপ্রিয় বিবেকবান মানুষ ‘‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও ‘‘ ব্যানারের নীচে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করেছিল। প্রবীণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সালেহ চৌধুরীর কাছ থেকে শুনেছি যে, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান দাঙ্গা দমনের নামে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নামিয়ে দাঙ্গাবাজদের সহায়তা করছিল। ঐ সময় তৎকালীন গভর্নর হাউজে (বর্তমান বঙ্গভবন) এক সর্বদলীয় বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গভর্নর মোনায়েম খানকে মুখের ওপর বলেছিলেন, ‘‘আপনি এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করেন, আমরা দেখব কিভাবে দাঙ্গা থামাতে হয়। সালেহ ভাইয়ের ভাষায়, যেই কথা, সেই কাজ। বঙ্গবন্ধু নেমে পড়লেন রাজপথে। ‘‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও‘‘ কমিটির ব্যানারে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিল্পী-সাহিত্যিক সহ সর্বস্তরের শান্তিপ্রিয় মানুষ স্কোয়াড করে লাঠি হাতে দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন।

শুধু তাই নয়, কোলাকাতার ভয়াবহ দাঙ্গা চলাকালেও বঙ্গবন্ধু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন। জাতির জনক শেখ মজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী‘র চ্যাপ্টার জুড়ে রয়েছে ঐসব লোমহর্ষক কাহিনী। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই যে, জাতির জনকের আদর্শকে ধারন করে তার দেখানো পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে থাকতে হবে।

Comments

comments