সুত্রপাত / ইতিহাসের পাতা / ফিরে দেখা রুশ বিপ্লব || আর্য সারথী

ফিরে দেখা রুশ বিপ্লব || আর্য সারথী

বর্তমান গোলকায়নের যুগে দাঁড়িয়ে, সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের সংগ্রামকে উপলব্ধি করে আমরা যদি শতবর্ষী অদূর অতীতের পানে ফিরে তাকাই তবে এই বিশ্বব্যাপী সংগ্রামের সূচনারেখা রুশ বিপ্লবকে অবলোকন করি। এই রুশ বিপ্লব ছিলো সহ¯্রবর্ষী তিমিরাচ্ছন্ন সংগ্রামী ইতিহাসের আলোকবর্তিক যা দেশে দেশে মানব মনে জ্বেলেছিলো বিপ্লবের আলো। সেই থেকে একযোগে শুরু হওয়া সংগ্রামে মানুষ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে ও নিরন্তর সংগ্রাম করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়তো এখন আর নেই। কিন্তু রুশ বিপ্লব আছে, থাকবে। ইতিহাসকে সে অনেক দিয়েছে। তাই আমরা আবার তাকে ফিরে দেখছি। তার থেকে প্রেরণা নিচ্ছি এবং আগামী দিনের বৈপ্লবিক প্রকল্পসমূহকে এগিয়ে নিচ্ছি। রুশ বিপ্লবকে ফিরে দেখতে গেলেই আমাদের মাথায় আসে স্বপ্নের কথা এবং মানুষেরর আকাক্সক্ষার কথা। সে আকাক্সক্ষা ন্যায়ের, একটি সুস্থ্য-স্বাভাবিক-সুন্দর জীবনের এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার। রুশ বিপ্লবের পূর্বে এগুলো শুধু “কল্পিত প্রকল্প” আকারে আমাদের মাঝে হাজির ছিলো। রুশ বিপ্লব সর্বপ্রথম প্রমাণ করলো মানুষের এই স্বপ্ন-এই আকাক্সক্ষা যা “কল্পিত” আকারে হাজির ছিলো তার বাস্তবায়ন সম্ভব। স্বপ্ন বা আকাক্সক্ষা ইতিহাসে অনেক সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রুশ বিপ্লব তারই উদাহরণ।

রুশ বিপ্লব এর “বিপর্যয়” এর কথা যদি তোলা হয় তবে বলতে হয় “বিপর্যয়” শব্দের মধ্যে ব্যাপক সমস্যা আছে। আমি তাই “ তথাকথিত বিপর্যয়” বলার পক্ষপাতি। শুধু “বিপর্যয়” বললে তা বিপ্লবকে অপমান করা হয়। কারণ এতে মনে করা হয় মার্কস-লেনিনের মতাদর্শ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সোভিয়েত পতন কার্ল মার্কসের “ভবিষ্যত বাণীর” যথার্থতা ধরিয়ে দিচ্ছে। রুশ বিপ্লবকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেনিনকে হাজার গালাগালি করা যাবে, তত্ত্বের নয়; মডেলের দোষ, মার্কসবাদ ভুল, স্ট্যালিন মহাশয়তান কিংবা এ কেবল সামাজিক সা¤্রাজ্যবাদের পতন হয়েছে। প্রভৃতি ধরনের “চায়ের কাপে ঝড়” বারংবার তোলা যাবে এবং তোলা হচ্ছেও। কিন্তু এটা কোনো গঠনমূলক কাজ নয়। প্রয়োজন গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা।

লেনিনের আমলে “একদেশে সমাজতন্ত্র” নিয়ে একটা তর্ক উঠেছিল। সোভিয়েত বিপ্লবের তথাকথিত বিপর্যয় তার সমাধান করেছে এবং আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, এটা অসম্ভব। মার্কস ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের বিষয়কে সন্দেহ করতেন ব্যাপক। মার্কসের ধারণানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী পুঁজি তার অবনত সবকিছুকে ধ্বংস করে অগ্রসর হবে, ফলে সা¤্রাজ্যবাদের দূর্বল কেন্দ্রে কিয়ৎকাল সমাজতন্ত্র কায়েম করা গেলেও তা টিকে থাকে না। তাই সমাজতন্ত্র বৈশ্বিকভাবে ঘটবে কিন্তু কাজ আমাদের করে যেতে হবে দেশীয়ভাবে। আর “তত্ত্ব” নিয়ে যারা কথা বলেন তারা বারংবার ভুলে যান তত্ত্ব দুই ধরনের হয়। (১) সর্বজনীন ও (২) আপেক্ষিক। সর্বজনীন তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্যই আপেক্ষিক তত্ত্ব সমূহের উদ্ভব হয়। তাকে নির্মাণ করার পথে কিছু ভুল দেখা দেয় এবং দেবেই। যা আমরা লেনিন স্তালিনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছি। এরজন্য তাদেরকে বৃথা গালাগালি করা পাগলের প্রলাপ বকার চেয়ে বেশি কিছু নয়। রুশ বিপ্লবের এই যে তথাকথিত বিপর্যয় এর থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা নেবার আছে। শুধু রুশ বিপ্লবের তথাকথিত বিপর্যয় নয়; গোটা কর্মযজ্ঞ (১৯১৭-১৯৯০) তার থেকে আমাদের শিখতে হবে। যার ফলে আগামী দিনে আমাদের সংগ্রাম আরো বেগবান হবে। যথা:
১। দেশে দেশে কৃষক ও শ্রমিকের বিপ্লবী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং বৃহৎ জনগণ যাতে এই বিপ্লবী ঐক্যে সামিল হয় তার জন্য কাজ করতে হবে।
২। বিপ্লবী বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বচর্চা ছাড়া কোনোভাবেই আমাদের কার্যসিদ্ধি সম্ভব নয়। আমাদের কেবল অর্থনৈতিক শ্রেণী আকারে সর্বহারা শ্রেণিকে একত্র করলে চলবে না, সর্বহারা শ্রেণীর মৈত্রী ঘটাতে হবে রাজনৈতিক ও দার্শনিক আকারে।
৩। অযথা বুর্জোয়া বিকাশকে সমালোচনা করা দার্শনিক ভুল। বরং কৃষক-শ্রমিকের বৈপ্লবিক মৈত্রী দ্বারা সামন্ততন্ত্রের পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটাতে হবে এবং বিপ্লবী গণ ঐক্যের মাধ্যমে পুঁজির বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে হবে। (যেটা লেনিন করে ছিলেন। লেনিন যে “জাতীয়করণ” এর প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন তা সেই বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য। এমনকি লেনিন মার্কস উথাপিত একটি সমস্যাকে এর মাধ্যমে সমাধান করেছিলেন।)
৪। প্রত্যেক দেশের ভৌম ভাবনা হতে বিপ্লবের রসদ বের করতে হবে। লেনিন ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। আর প্রত্যেক দেশে বিপ্লবী কর্মপন্থায় নিজস্বতা থাকতেই হবে।
৫। প্রত্যেক দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য কাজ করতে হবে। কারণ এক দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব-ই সম্ভব।
৬। গণ ঐক্য গড়ে সেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যদি এক পার্টির দ্বারাই কাজ করার ভাবনা থাকে তবে তাকে ত্যাগ করতে হবে। কোনো পার্টিই সারাজীবন বিপ্লবী থাকে না। পুরোনো ধাঁচের পার্টি মাত্রেই সংশোধনবাদী।
৭। বিপ্লবী শক্তি সমূহের মৌলিক কর্তব্য হলো জনগণের মাঝে বিপ্লবী মূল্যবোধ গড়ে তোলা। যাতে কেবল পার্টিই নয় জনতা যেন হয় বিপ্লবের কান্ডারী। যেদিন জনতার মাঝে বিপ্লব “মূল্যবোধ” আকারে বিরাজ করবে সেদিন আর ক্ষমতায় আসার জন্য পার্টিকে বুর্জোয়া পার্টির মতো যুদ্ধ করতে হবে না, জনগনই তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবে। এই জিনিসগুলো আমরা “শিক্ষা” আকারে পাই (১৯১৭-১৯৯০) কে বিশ্লেষণ করলে।
৮। সমাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা এক ধারণা নয় এবং “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” বলতে কোনোভাবেই রাষ্ট্রের সর্বময়তাকে বোঝানো যাবেনা।

রুশ বিপ্লবের অন্যতম বড় দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে লেনিনের চিন্তাধারা। লেনিন বহু মার্কসীয় চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তার মধ্যে কিছু ভুল-ভ্রান্তি আছে, যা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। তবে লেনিনের “বড়” মৌলিক কাজ হলো “কৃষক শ্রমিকের বিপ্লবী ঐক্য ও “জাতীয়করণ”। আরো অনেক কাজ আছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে লেনিনের চেয়ে বড় তাত্ত্বিক এখনও নেই। তিনি রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন তা অত্যন্ত অকাট্য এবং মৌলিক। তবে এখন চলমান আলোচনায় তা আলোচনার দরকার নেই। তার চেয়ে বেশি দরকার “মৈত্রী” সম্পর্ক বোঝা। মার্কস ও এঙ্গেল্স সমাধান করতে পারেননি কিভাবে কৃষক শ্রমিকের ঐক্য করা যায়। লেনিন সেটা সম্ভব করেছেন। তিনি লেভ তলস্তয়ের লেখা পড়ে কৃষকের বৈপ্লবিকতা সম্পর্কে বুঝেছেন এবং কৃষকও যাতে “ভ্যানগার্ড” হিসেবে আবির্ভূত হয় এর জন্য “জাতীয়করণ” এর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। কারণ এই জাতীয়করণের ফলে-
১। সামন্তবাদ পুরোপুরি বিনষ্ট হয়।
২। পুঁজির ত্বরান্বিত বিকাশ ঘটে।
৩। কৃষকের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন হয়না এবং সে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না।
৪। কিন্তু শ্রেণিচেতনা বিকাশের মাধ্যমে কৃষকও বিপ্লবী শক্তি আকারে আর্বির্ভূত হয়।
এটাই লেনিনবাদের মৌলিকত্ব। আমাদের ব্যবহৃত “কাস্তে-হাতুড়ি” প্রতীকটিও এই দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।
একটি বিষয় আমরা বুঝতে বরাবর অসমর্থ্য হই তা হলো: বিপর্যয়ে ফলে আমাদের স্বপ্ন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও এর কিছু ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে। আমরা যদি তাকে উপলদ্ধি করতে পারি। তবেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব। যথা:
১। সোভিয়েতের যে উপনিবেশগুলো ছিলো তা স্বাধীন হয়েছে। সে কাজটি লেনিন করতে অসমর্থ্য হয়েছিলেন (আমরা থাকলে আমরাও হতাম) তা ৯০ এ সমাপন হয়েছে।
২। সারা দুনিয়াব্যাপী অনাকাঙিক্ষতভাবে “রুশ পার্টির চিন্তা” মার্কসবাদ-লেনিনবাদ নামে দার্শনিকভাবে আমাদেরকে বন্দী করেছিলো আমরা আজ সে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়েছি। এটা অবশ্যই প্রগতি।
৩। রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে “সর্বহারা একনায়কত্বের” নামে যে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের সাথে পার্টির আমলাতন্ত্র গঠিত হয়েছিল এবং জনতার উপর যেভাবে বল প্রয়োগ করা হয়েছিল তাতে সমাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমছিল বই বাড়ছিল না। সে অবস্থা আজ নেই।
৪। রুশ বিপ্লব প্রকৃত প্রস্তাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিলো না। লেনিন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়, চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক বিপ্লব। পরে নিজের মতামত থেকে লেনিন সরে গিয়েছিলেন। (যদিও এতে সারা দুনিয়াব্যাপী মানুষ বিপ্লবী হতে শুরু করে)। যাই হোক এতে সমাজতন্ত্র কায়েম না হোক রাশিয়ার বাধাপ্রাপ্ত হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এখন গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে নিশ্চিহ্ন করার পায়তারা চলছে তবুও স্বীকার করতে হবে এতে ব্যাপক ভুল ছিলো এবং আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এমন কি রুশ সমাজতান্ত্রিক ধারার এমন অবস্থার ফলে সত্যিকার সমাজতন্ত্রের পথে আমাদের এগিয়ে যাবার জন্য পথ পেয়েছি, একথা অনস্বীকার্য।
এত কিছুর পরও অনেকে ভাবতে পারেন যে সমাজতন্ত্রের গর্ভ থেকে পুঁজিবাদ জন্ম নিয়েছে। মূলত সমাজতন্ত্রের গর্ভে পুঁজিবাদ জন্মায়নি। বরং এধরনের ব্যবস্থাকে “সমাজতন্ত্র” বানাবার চেষ্টা করলে তা যে ফলপ্রদ হবেনা এটাই তার প্রমাণ। “রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব” হলো ইতিহাসের এক এমন উদাহরণ যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে “মানুষই ইতিহাস নির্মাণ করে”। রুশ বিপ্লবকে নিয়ে আমরা যত কথাই বলিনা কেন, লেনিন একে” “সমাজতন্ত্র” আখ্যা দেয়ায় লেনিনকে আমরা যতই গালাগাল দেই না কেন এর ফলে সারাবিশ্বে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তাই একে আমরা পুরোপুরি নিন্দা করতে পারিনা। তাছাড়া এটাই হয়তো লেনিনের রাজনৈতিক কৌশল ছিলো। আমরা যাকে লেনিনের “নিজ মত থেকে সরে যাওয়া” বলছি।
জনতার সার্বভৌমিত্ব, নারীর ভোটাধিকার, অবৈধ শিশুর অধিকারের ঘোষণা সবই আমরা পেয়েছি রুশ বিপ্লব থেকে। বর্তমান দুনিয়ার বহু স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছে সোভিয়েত। রুশ বিপ্লবের এই দিকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুশ বিপ্লব না হলে এগুলো সম্ভব হতো না। আমরা হয়তো আজও কোনো এক উপনিবেশবাদী যুগে বাস করতাম।
রুশ বিপ্লব আমাদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক কর্মের বাতিঘর। রুশ বিপ্লব আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে: বিপ্লবের নামে আজেবাজে কথা বলে রাস্তায় সশস্ত্র লোক নামানোর দিন শেষ। বিপ্লব অনিবার্য। কোনো শক্তিই একে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা যারা বিপ্লবে বিশ্বাস করি তাদের নৈতিক কর্তব্য হলো বিপ্লবকে গুরুত্বের সাথে বোঝা এবং বিপ্লবী প্রকল্প সমূহকে কার্যকর করা। তবেই রুশ বিপ্লব সার্থক হবে।

লেখক: গবেষক।

Comments

comments