সুত্রপাত / গবেষণা / প্রণয়তত্ত্ব বিশ্লেষণ
saroti

প্রণয়তত্ত্ব বিশ্লেষণ

আর্য সারথী:
“প্রণয়” শব্দের অর্থ নর- নারীর প্রেম এবং “তত্ত্ব” শব্দের অর্থ স্বরূপ বা প্রকৃত রূপ। অর্থাৎ প্রণয়ের প্রকৃত রূপকে অনুধাবন করা বা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করার চেষ্টায় এই আলোচনার অবতারণা। বলা যেতেই পারে, এতকিছু থাকতে শেষে প্রেম নিয়ে লেখা কেন ? এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ কৈফিয়ৎ দেয়া বাঞ্ছনীয়। আসলে প্রণয়কে বর্তমান ভোগবাদী প্রবণতার মাধ্যমে ব্যাপক মাত্রায় কলুষিত ও অপবিত্র করা হচ্ছে। যার ফলে মানুষ এই বিষয়ে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে, সবার দশা হচ্ছে অনেকটা “শিব গড়তে বানর গড়ার” মতো। তাই এইধরনের ব্যাপার চলতে দেয়া অনুচিত। কারণ সমাজের রূপান্তরের কর্মের সাথে এরও খানিকটা যোগসূত্র তৈরি হতেই পারে। যেহেতু আময়াদের কাজ হচ্ছে সকল প্রকার অন্যায় অবিচারের বিপক্ষে লড়াই করা ও তার দর্শনকে খণ্ডন করা তাই তার একটি প্রকল্প হিসেবে আমাদের উচিত এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া আমার বন্ধুমহল প্রায়শ আমার মতামত জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে এই বিষয়ে। আমার কাছে বারংবার শুনতে চেয়েছে এই প্রণয়ের কথা। তাই আর বসে থাকতে পারলাম না।কৈফিয়তের পালা সাঙ্গ করে এবার আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

“প্রণয়” খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জীবনে। একে তাই বুঝতে হবে মনোযোগ সহকারে ও অত্যন্ত সচেতনভাবে। নিছক বালখিল্য যেমন: ভালবাসা দিবস পালন, অযথা একসাথে ঘোরাঘুরি ও দুদিন পর সম্পর্ক ত্যাগ করা এবং প্রথম দর্শনে প্রেম হয়ে যাওয়া (!) দ্বারা প্রেমকে বা প্রণয়কে বোঝা যাবেনা। প্রণয় জাগতিকতাকে ছাপিয়ে আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশ করে তবে এতে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি বিশ্বাস নয়, রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। প্রকৃত প্রণয়ে কয়েকটি বিষয়ে কয়েকটি বিষয় থাকে।যথা: (১) বিশ্বাস (২) আবেগ/ অনুভূতি, (৩)পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, (৪) নিঃস্বার্থতা, (৫) একসাথে চলার প্রতিজ্ঞা এবং (৬) কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এবার এগুলো সম্পর্কে বোঝা আবশ্যক।

বিশ্বাস: বিশ্বাস এক জীবনধর্মী এবং বহুমাত্রিক ব্যাপার। বিশ্বাস হলো বেঁচে থাকার ভিত্তি। যদি এটি না থাকত মানুষ বাঁচতেই চাইত না। বিশ্বাসের সাথেও আবার কয়েকটি বিষয়ের সম্পর্ক আছে। যথা:

(১)  সৎ ও নিষ্ঠাবান হবার সম্পর্ক;
(২) আস্থা( নির্ভরশীলতা) স্থাপনের সম্পর্ক;
(৩) আশা করার সম্পর্ক;
(৪) যুক্তির সম্পর্ক ও
(৫) মননশীলতার সম্পর্ক।

সৎ থাকা বলতে বোঝায় নিজের নীতি- নৈতিকতা- আদর্শের প্রতি সৎ থাকা। এর মানে হচ্ছে মানুষ ও মানবতার প্রতি সৎ থাকা।আশা বলতে সত্যিকার অর্থে মনের জোর বোঝায়। মূলত এর উপরেই সারা দুনিয়া ভর করে চলে। আস্থা বলতে বোঝায় ভরসা, অবলম্বন বা নির্ভরশীলতা। আমরা কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নই, সবাই নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে দেখা যায় কেউ আস্থা ভঙ্গ করে আবার কেউ সারাজীবন আস্থার ব্যাপারটা ঠিক রাখে। আবার যুক্তি ছাড়া কোনো বিশ্বাস দেখা যায়না। এটা শুনতে অবাক করা হলেও সত্য যে বিশ্বাসের পেছনে যুক্তি থাকবেই। আর মননশীলতা বা সৃষ্টিশীলতা থাকতেই হয়। কারণ এর সাথে যেহেতু জীবনের সম্পর্ক তাই জীবনের চলমানতার সাথে সাথে প্রতিক্ষণে এটি নবরূপে উদ্ভাসিত হয়। এই বিশ্বাসই আসলে প্রণয়ের ভিত্তিরূপে কাজ করে। আর বিশ্বাসটাও দুজনের মধ্যে তৈরি হতে হবে তাহলেই হবে প্রকৃত প্রণয়।

আবেগ/অনুভূতি : আবেগ বা অনুভূতি বলতে প্রণয়ের ক্ষেত্রে বুঝতে হবে অপরকে বোঝা। কারণ আবেগ বা অনুভূতি বলতে আমরা বুঝি বাস্তবের সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া। এর মানে হলো মনের উপর রয়ে যাওয়া বাস্তবের ছাপ। এর মাঝে রয়েছে প্রচণ্ড এক
দার্শনিকতা। কারণ অপরের অনুভূতি যদি না বোঝা যায় তাহলে আবার কেমন প্রেম? তাই আবেগ এর ব্যাপার যখন আসে তখন তা অপরকে বোঝার ব্যাপারে পর্যবসিত হয়। দৈহিকভাবে আলাদা হলেও মানসিকভাবে এক হওয়াতে প্রেম হয়। আর তাই যদি হয় তাহলে অপরের আবেগ সহজেই বোঝা যায়।

পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ: দুজনের প্রতি যদি দুজনের শ্রদ্ধা না থাকে, একজন যদি অপরজনকে তুচ্ছ মনে করে ,অপরকে মূল্যায়ন না করে বা প্রাপ্য সম্মান না দেয় তাহলে তা কোনোভাবেই প্রণয় নয়। প্রণয়ে আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কারণ প্রেম অপরকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। ভালবাসার একটা রূপ হচ্ছে শ্রদ্ধা। নিঃস্বার্থতা: প্রণয়ে কোনো স্বার্থপরতার স্থান নেই। এখানে কোনো স্বার্থের (স্বার্থসর্বস্বহীনতা বুঝতে হবে,স্বার্থহীনতা নয়) ব্যাপার জড়িয়ে থাকেনা। জাগতিক নাম, যশ, লোভ, লালসা, অর্থ প্রভৃতির মুখাপেক্ষী নয় প্রণয়। একসাথে চলার প্রতিজ্ঞা: মূলত প্রণয়ীযুগল যদি একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী না হতে পারে বা একে অপরকে অগ্রসর করার কাজ না করে তবে তাতো স্রেফ প্রতারণা হবে। হবে নিছক দৈহিক আকর্ষণ। তাই প্রণয় হতে গেলে থাকতে হবে একসাথে চলার প্রতিজ্ঞা।

কাছে পাবার আকাঙ্ক্ষা: এই ব্যাপারটা দুই ধরণের। এক হলো দৈহিক আর অপরটি হলো মানসিক। দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে বলা যাক দৈহিক ব্যাপার নিয়ে। যত গোল সব একে নিয়েই। এই বিষয়টা নিয়ে  হাল আমলে বিতর্ক তুঙ্গে। প্রকৃতপক্ষে প্রণয় প্রকাশের এক অন্যতম মাধ্যম হলো সঙ্গম। অনেকে বলে থাকেন সঙ্গমেচ্ছাই প্রণয়ের মূল। আসলে এগুলো হলো স্থূলনৈতিক কথা। সঙ্গমেচ্ছাকে অবজ্ঞা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু কেবলমাত্র এর দ্বারা প্রণোদিত হয়ে নিজের জীবন ও সমাজকে কলুষিত করা শুভবুদ্ধির পরিচয় নয়। বরং এটা নিয়ে ছেলেখেলা করা বন্ধ করতে হবে। এটা অনেক উঁচুস্তরের বিষয়। এতে কোনো ভোগবাদী মানসিকতা থাকা উচিত নয়। সঙ্গম হলো নিজেকে অপরের সাথে একাকার করা বা নিজ ও অপর একক সত্তায় পরিণত হবার বা লীন হবার একপ্রকার দৈহিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে আসে আনন্দের অনুভূতি, এক হয়ে যাবার অনুভূতি। অর্থাৎ দৈহিক ব্যাপারের কথা বলতে বলতেই মানসিক ব্যাপার চলে এসেছে। শাস্ত্রে আছে, মন হচ্ছে দেহের আকাশস্বরূপ। ফলে মন ও দেহকে আলাদা করে বিচার বেশ কষ্টসাধ্য। তবে বহুলতা পরিহার না করেই বলা ভাল, একে অন্যের জন্য যে প্রতিনিয়ত অপেক্ষা করে চলা এটাও মানসিক ব্যাপারের অন্তর্ভুক্ত। আমরা প্রণয়ের মূল ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করেছি। এবার আমাদের কর্তব্য হলো সর্বপ্রকার কলুষতা হতে একে রক্ষা করা। 

লেখক: গবেষক ও যুক্তিবাদী লেখক।

Comments

comments

error: Content is protected !!