সুত্রপাত / সম্পাদকের কলম / ‘পুরুষতন্ত্র’কে জায়েজ করার কিছু নেই ।। লাবণী মন্ডল

‘পুরুষতন্ত্র’কে জায়েজ করার কিছু নেই ।। লাবণী মন্ডল

লাবণী মন্ডলঃ

 হত দরিদ্র, পশ্চাৎপদ, কুসংস্কারাবদ্ধ বাংলাদেশের নারী সমাজ দারিদ্র্যের কশাঘাতেতো বটেই উপরন্তু সামাজিক-পারিবারিক শোষণ-নির্যাতনের জর্জরিত। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীসমাজ চিরকাল অবহেলা, নির্যাতন ও বৈষম্য ভোগ করছে। কিন্তু অতীতে এ অবস্থাটা ছিল শুধুই নারীর ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া, আজ তা হয়েছে সংশয়পূর্ণ ও প্রশ্নাকুল। আজ নারীরা প্রশ্ন করতে পারেনা। এটাই কেনো আমাদের ভাগ্য হবে? নারীদের ভাগ্যেই কেনো এরকম যতসব আজগুবি নিয়ম-কানুন! হাজার বছরের অন্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আজ প্রশ্নবিদ্ধ করছে নারীসমাজ। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর জন্য নারীসমাজ আজ প্রস্তুত। নারীদের সংগঠিত করার জন্য যে পরিমাণ চিন্তা শক্তি দরকার তা সংগঠনগুলোর মধ্যে নেই বলে আজ নারীরা ফুঁসে উঠছে না।

কিন্তু ভিতরে ভিতরে নারীসমাজ ফুঁসে আছে, যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে প্রস্তুত। হ্যাঁ, জীবনের তাগিদে, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার তাগিদেই বিস্ফোরণ ঘটবে। এক্ষেত্রে নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে সাথে চিন্তার মুক্তিটাও জরুরী। সেজন্য নারীদের মধ্যে কাজ করা, সংগঠিত করার গুরুত্বটা বেশি বলেই মনে হয়। এটা ‘সেকেন্ডারি সাবজেক্ট’ বলে ছেড়ে দেওয়ার কিছু নেই, সমাজের আমূল পরিবর্তন হলে নারীদের এমনিই মুক্তি আসবে তা ভাবারও অবকাশ নেই।

যুগে যুগে নারীরা নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, নিপীড়িত হয়ে আসছে। প্রথমত, শ্রেণীদ্বন্দ্বটা গুরুত্ব পেলেও বিবেচনায় আনতে হবে এই শ্রেণীর মূল হোতা কে- ওই পুরুষ শ্রেণীই। যে কারণে নারীমুক্তির জন্য পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটানোটা জরুরী। জেনেটিক্যালি পুরুষরা ‘পুরুষতন্ত্র’কে ধারণ করে বলে জায়েজ করার কিছু নেই, প্রশ্রয় দেওয়ারও কিছু নেই। বামপন্থী সংগঠন করার অবস্থায় বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই ঝোঁক খেয়াল করেছি। পুরুষতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক উঠলেই, প্রশ্ন তুললেই খুব ভাব-সাব নিয়ে বলতেন ‘পুরুষদের ভিতরে ‘পুরুষতন্ত্র’ থাকবেই। এখন দেখার বিষয় কে কতটা প্রয়োগ করে, কার কতটা অবদমন ক্ষমতা রয়েছে।’ মোটেও ঠিক না। এটাকে জায়েজ করার জন্য, সঠিক করার জন্য এসব ভাব-সাবের গুরুত্ব দেওয়া উচিত না। বরং নিজেদের ভিতরে ঐতিহ্য হিসেবে পুরুষতন্ত্র ধারণ করাকে ধিক্কার দেওয়া উচিত বের হয়ে আসা উচিত এসব ‘তন্ত্র-মন্ত্র’ থেকে। মানুষের তো কোনো তন্ত্র থাকতে পারে না! মানুষ তো ‘মানুষ’ হিসেবেই পরিচিত হবে। মানুষের ভিতরে এসব তন্ত্র টেনে এনে ‘মানুষ’ উপাধির হেয় করার মানেটা কি! নারীরা শ্রেণীআন্দোলন না করে বা শ্রেণীআন্দোলনে যুক্ত না হয়ে কেন নারী সংগঠন ও নারী আন্দোলন করে সেটা অনেকেই বুঝতে পারেন না। অর্থাৎ সমাজের যে বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তর আছে তার মধ্যে নারী ও পুরুষ এই তো দুই অংশ। প্রতিটি শ্রেণী ও স্তরের সমস্যা নিয়ে মানুষের আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা যোগ দিলেই তো তার সমস্যা মিটে যাবার সম্ভাবনা ত্বরান্বিত হয়। তবে কেন নারীরা ভিন্নমঞ্চ ব্যবহার করে আন্দোলন করছে তা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না এবং এটা নারীদের দুর্বলতারই প্রকাশ বলে অনেকে মনে করেন। এই প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে স্বাভাবিকভাবে ভাবুন না! সমস্যা কি! একটু সহজভাবে ভাবুন, সুন্দরভাবে ভাবুন। আচ্ছা, নারীরা কি শ্রেণী আন্দোলনে নেই? মানবমুক্তির আন্দোলনে নেই? অবশ্যই! বরং অনেক সময় এসব আন্দোলনে নারীর ভূমিকাটা অনেক গুণে বেশি। ইতিহাস তাই বলে। ইতিহাস দিয়ে কথা কওয়ালে বুঝে যাবেন ইতিহাসে নারীর অবদান। হ্যাঁ, এর বাহিরেও নারী আন্দোলনটার গুরুত্ব রয়েছে। যেমন গুরুত্ব রয়েছে শ্রমিক আন্দোলনের। মানবমুক্তি হলে তো শ্রমিকদেরও মুক্তি হবে, বলে তো শ্রমিক আন্দোলন বন্ধ করে দিতে পারেন না! ঠিক তেমনিই, মানবমুক্তির অজুহাতে ‘নারী-আন্দোলন’ করার প্রয়োজনীয়তা নেই এই ধরনের মনোভাব পরিত্যাগ করুন। ব্যাখা চাইবেন তো! দিচ্ছি, নারীদের যে নিত্যদিনের সমস্যা-সংকট সেগুলো নিয়ে আলাদাভাবে নারী আন্দোলনটা করতেই হবে। নচেৎ আপনি/আমি নারীদের সংগঠিত করতে পারবো না। কেননা, কোনো আন্দোলনই সংগঠিত হয় না যদি না তাদের ভিতরের সংকটগুলোকে গুরুত্ব না দেন। শ্রমিক আন্দোলন করতে গিয়ে সমাজতন্ত্রের শিক্ষা আপনি কখন দিবেন? যখন শ্রমিকটি ‘অগ্রসর শ্রমিক’কে পরিণত হবে। নিজেদের দাবি-দাওয়া আন্দোলনে অগ্রসর ভূমিকা পালন করবে। ঠিক তখনিই আপনি তাকে আমূল পরিবর্তনের শিক্ষা দিতে পারবেন। প্রথমে গিয়েই সমাজতন্ত্র শিখাতে গেলে হীতে-বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ঠিক তেমনি নারীদেরকে রাস্তায় নামাতে হলে, তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে হলে, জাগাতে হলে তাদেরই সংকটগুলো তুলে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। আর সেজন্যই নারীদের সংগঠন জরুরী, নারীদের আলাদাভাবে সংগঠিত করা জরুরী। মানুষ স্বভাবতই নিজের সুখানুভূতি চায়। যখন নিজের স্বার্থটা বুঝে তখনই মাঠে নামেন। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই তো! আপনি/আমার ভালো লাগা থেকেই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি। এটা শুধু জনগণের জন্য বলে নিজেদের দায় এড়ানো মানে নিজেদের ওই আন্দোলনের সাথে একতাবদ্ধ না করা। এই নেতিবাচক মতামতের পাশাপাশি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশের মানুষ নারী আন্দোলনকে নারী প্রগতির ধারায় নারী জাগরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সেজন্যই ব্যাপক নারী গ্রামবাংলার সর্বত্র ঘরের বাইরে সমবেত হচ্ছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, নারী জাগরণ যারা আকাক্সক্ষা করেন, নারী প্রগতি যাদের কাম্য তাদের পরিবারের মেয়েরা নারী আন্দোলনের যেকোনো সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রেও সমস্যা থেকে যাচ্ছে। কিন্তু সার্বিকভাবে নারী জাগরণের সূত্র ধরে সমবেত ও আগত মহিলারা নারী আন্দোলনের মর্মবাণী শুনছেন, তাতে বৃহত্তর পটভূমিকায় সমাজের মন-মানসিকতা পরিবর্তনে ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে সেটাই বর্তমান সময়ের সাফল্য। ‘পুরুষতন্ত্র’কে জায়েজ না করে নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে গড়ে তুলুন নতুন বিশ্ব, নতুন জগৎ।

জয় হোক মানুষের জয় হোক মানবতার সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ

Comments

comments