পাগলের মিছিল

হিমাংশু দেব বর্মণ:
ফাল্গুনের এই খাঁ খাঁ দুপুরে একা রান্না ঘরে জানি না কী ভেবে কী রানছ। অগোছাল হাতের ঘোটায় ডাল রানছ, না হয় মুঢ়ী ঘণ্টই হয়! অত শত ভাবার দরকার নেই। বাজেট মতো রান্নাটা হলেই হল। রস করে আর কী হবে! নিয়তি যখন মানুষের মাঝে ভর করে তখন সব ক্ষেত্রে একই রূপে। সবাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলে। কিন্তু কেন? তার মধ্যাহ্নে তো গাছের পাতাগুলোকে অনবরত ঝরতেই দেখছি। আউলিয়া বাতাসে পাতা ঝরার নির্মম সুরের মাঝে শোনা যায় দাঁড় কাকের কর্কশ কান্না। সামান্য একটা বিল্ডিং-এর এপাশ ওপাশ। ব্যবধান এতটুকুই। কিন্তু পার্থক্য বড় নির্মম। এর উল্টো দিকটাতে লোকের কোলাহল। গায় গায় মানুষের ভিড়ে চলতি গাড়িগুলোর গতিও মন্থর। বড় রাস্তার পাশ দিয়ে দোকানগুলোতে ঢোকা যায় না। গাড়ির ধোঁয়া আর মানুষের ঘেঁষাঘেঁষিতে এক বিভৎস্য পরিবেশ। তবুও মানুষ চলছে আপন আপন তাগিদে। কিন্তু সদর দিকটার পরিবেশ আরো বিভৎস্য, নির্মম। এখানে এসে মনে হল জীবনের কোন একটা অধ্যায়ের অপমৃত্যু ঘটল আমার। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের মৃত দেহটাকে যেখানে রাখা হয় কেবল সেখানকার পরিবেশই এমন হতে পারে। মনে হল কবি কায়কোবাদ এমন দিনে এমন একটা জায়গাতে বসেই মহাশ্মশানের দৃশ্যটা রচনা করেছিলেন।
ছয়টা বিল্ডিং দিয়ে চারপাশ ঘেরা। মাঝখানে একটা পার্টিশান। দুই পাশে ছোট্ট করে দুটো উঠোনের মতো। পূব উঠোনে শিশু ও মেহগণি গাছ। পশ্চিম ভাগের শেষ প্রান্তে প্রায় একটি পাকড় গাছ। জনমানব দূরের কথা, কোন পশু প্রাণীর গন্ধ সেখানে নেই। শিশু মেহগণি গাছগুলোতে দু’চারটে কচি পাতা। আধ নাড়া ডালগুলো এখনো সবুজে ভরেনি। তার মাথায় কতকগুলো কাক কা-কা করে চলেছে। আবার কর্কশ কণ্ঠে টানা সুরে গলা সাধছে। সুরটা ভয়ঙ্কর লাগছে। সব মিলে শ্মশানের পরিবেশ।
বড় রাস্তার ঠেলাঠেলি আর গাড়ির ধোঁয়া অসহ্য লাগলে এপথে এখানে এসে পড়েছি। পাচিলের গেট দিয়ে ঢুকেই গা ছম ছম করে উঠল। শুকনো পাতাগুলো তলায় পড়ে। আধনাড়া ডালগুলোর মাথায় বসা কাক পাখিগুলোর সুর সাধা বাদ দিলে একেবারে শ্মশানের নীরবতা।
এ কী! যা ভাবছি তাই কি? বারান্দায় একটা লাশ! তাহলে কি এখানে লাশ দাহন করা হয়? এগিয়ে যাই পশ্চিম দিকটায়। মাঝের পাঁচিলের গায়ে শহীদ মিনারটাকে মনে হল চিতা। মনটা কেমন সংশয়ে আচ্ছন্ন। ভাবলে ভ্রান্তি বিলাসও মনে হয়। পশ্চিম ভাগের দক্ষিণ বিল্ডিং-এর বারান্দায় বসলাম। এতক্ষণে ওই কাকগুলো ছাড়া একটিও অন্য পাখি এসে বসল না গাছের ডালে। ফিঙে, দোয়েল, ঘুঘু, শালিকেরা যে কোথায় গেছে! একটা কোকিল তো অন্তত থাকতে পারতো। বাসন্তি দুপুরে কোকিলের ডাক কার না ভালো লাগে? আউলিয়া বাতাসে তলায় পড়া পাকড় পাতাগুলো এদিক ওদিক ছিটকে পড়ল। আমি চমকে উঠলাম। বুঝলাম কু-সংস্কার আর দুর্বলতায় আমাকে পেয়ে বসেছে।
মন থেকে সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যাই লাশটার দিকে। পূর্ব বিল্ডিং-এর বারান্দায়। দেহের উপরিভাগে ছায়া। মাজা থেকে পা পর্যন্ত খাঁ খাঁ রোদ। আধো রোদ্দুর আধো ছায়ায় নিনড় পড়ে থাকা ভিখারী পাগলের দেহটাকে লাশই মনে হয়। ছালার পোশাক পরা। মাথার নিচে ছালার বোচকা। ভিতরে হয়তো তার কুড়িয়ে রাখা মূল্যবান কাগজ আর ছিট কাপড়ের টুকরো। পায় পায় এগিয়ে দেখি লাশ নয়। ঝিরঝিরে বাতাস আর রোদের আমেজে ভিকারী পাগলটি মহা সুখে ঘুমিয়ে আছে। এ যুগে পাগল হলেই যেন শান্তি পেতাম। ওর তো কেবল প্যাট নিয়ে ভাবনা। ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তা খেয়ে মহাশান্তিতে ঘুম যাচ্ছে। আর আমাদের মতো সভ্য মানুষের ঝামেলা কত! এটা একটা মফঃস্বল শহরের স্কুল। আজ ছুটির দিন। তাই এখানে কোন লোক নেই। একারণেই কোন পশু প্রাণীও না থাকার অযৌক্তিকতা নেই।
ভাবছি নানা কথা। এই মিষ্টি রোদেলা দুপুরে কী হলে ভালো লাগতো। আসলে ওর শান্তি দেখে আমারও স্বাদ হচ্ছে। কিন্তু কই? আমার যে অনেক বাধা। ঘরে অসুস্থ মা, বৃদ্ধ বাবা, রান্না ঘরে একা সোমত্ত বউডা। ওর দিকে ওৎ পেতে বসে আছে পাড়ার অনেকগুলো রাক্ষুসে চোখ। দৈনিক পত্রিকার পাতা খুলে চমকে ওঠে ও। বলে ওঠে ওগো, ওগের চাউনি বালো না। উরা কিরাম গাল চ্যাগরায়ে হাসে। উরা আমারে কোন সুমা এসিড না মারে! তুমারে পথে ঘাটে ছুরি না মারে। আমার ভয় হয় গো!
যখনই এতটুকু শান্তির আশা করি, তখনই এসব ‘সমস্যার সমাধান’ চাই বলে মৌনমিছিলে তোলপাড় করে তোলে বিবেক। আর অন্তরের সব শান্তির শর্তগুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যায়। আবার হতাশাগুলো বাসা বাঁধে শূণ্য বুকের নির্জন কোলাজে। ওদিকে মিছিল চলে ‘ভাত চাইÑ কাপড় চাই।’
‘আমারও চাই।’
বলে লাফিয়ে উঠল পাগলটা। হঠাৎ আমাকে দেখে প্রশ্ন করল কি মিয়া, তুমার চাই না?
আমি কেবল মাথা নাড়লাম ‘চাই’। ও বলে যেতে লাগল। না, তুমার চাইনা। তুমার প্যাট পুরা আছে। কিন্তু আমার প্যাটে অনেক ক্ষিদে। মাগার খাবার নেই। জান, সেই ’৭১ সালের কথা? খাবার বুঝাই জাহাজ আসতিছিল বঙ্গোপসাগরে। তা আবার কিভাবে যে সা¤্রাজ্যবাদের ফাটকে আটকে গেল, তা আজও ছাড়া পায়নি। তাই তো আজ প্যাটে ক্ষিদের আগুনÑ! চিতার আগুনÑ, সারা দেশে, সারা বিশ্বে চিতার আগুন জিতাÑ। মিছিল এগিয়ে আসে শ্লোগান স্পষ্ট হতে থাকে ‘ভাত চাই কাপড় চাই’।
পাগলটা আবার ‘আমারও চাই’ বলে চিল্লাতে চিল্লাতে মিছিলের দিকে ছুটে গেল। হ্যাঁ, ওর পিছু নিতে হবে আমাকে। আগামী দিনের পত্রিকায় এটা হবে গরম খবর। আমিও আসি রাস্তার ধারে। দ্রুম্Ñ একটি লোকও দেখা গেল না। শুধু কালো ধোঁয়ার অন্ধকার। মিছিল থেমে গিয়ে আবার জোর হল। সারা শহর ধোঁয়ায় ডাকা। একের পর এক বোমা ফাঁটে, মিছিলে আরও জোর হয়। লাশ কোলে করে মিছিল যায় থানা হেড কোয়াটারে। দফায় দফায় জোর হয় মিছিলে। অসংখ্য লোকের ভিড় ঠেলে সামনে যেতে চেষ্টা করি। ওরা বলে ওদিকে গিয়ে লাভ নেই। শোননি কতজন সাংবাদিক খুন হইছে? তার কোন কুলুই পায়নি। তুমি আর মরতে চাইও না। আমি কোন কথার উত্তর না দিয়ে নীরবে ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখি সমাজের অথর্ব পাগলটাও রেহাই পায়নি ওদের বুলেট থেকে।

Comments

comments

error: Content is protected !!