সুত্রপাত / রাজ্যের যুক্তি-তর্ক / পরিমাণে নয়, মান’ই জাতির পরিচয়

পরিমাণে নয়, মান’ই জাতির পরিচয়

শরিফুল হাসান সমাপ্ত:

শিক্ষা একটি জাতি গঠনের প্রধান উপাদান। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিতে এবং পারে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে। সেদিক থেকে পরিসংখ্যান দেখলে সাম্প্রতিক কালে আমাদের এগিয়ে থাকারই কথা, কেননা বিগত প্রায় ১০ বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পাসের হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সহজেই প্রতীয়মান হয় জাতি হিসেবে শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু সুশিক্ষিত কি হতে পারছি?পরীক্ষা মানে একটি মান। এই মান এর একটি পাশে থাকবে ফেল আর একটি পাশে পাশ। কিন্তু এখন এই মানটিকে এমনভাবে সহজলভ্য করা হয়েছে যে এই পরীক্ষা হচ্ছে পাশ করানোর পরীক্ষা যেখানে ফেল নামক কিছুই থাকবে না পরীক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যই হলো ফেল করানো, তাতে যারা পাশ করে তাদের মান সঠিকভাবে যাচাই হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ করে পাশের হার বাড়ালে অযোগ্য ছাত্র পাশ করবে তাতে পরীক্ষার আর কোনো মূল্য থাকবে না। আমাদের শিক্ষা মান এখন নামতে নামতে এতই নিচে নেমেছে যে আর নিচে নামা সম্ভব নয়। এখান থেকে উপরের দিকেই যেতে হবে নিচে আর জায়গা নেই।আরেকটি দুর্ভাগ্যজনক কথা হলো আমাদের সরকারগুলোর সফলতা ব্যর্থতা আমরা নিরূপণ করি পরীক্ষা পাশের হার এর মাধ্যমে। যে কারণে সরকার শুধু পাশের হার বাড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় শিক্ষার মান না বাড়িয়ে। এটি চরম একটি নির্বুদ্ধিতার পরিচয় আমাদের।

প্রশ্ন হলো এই বিশাল অঙ্কের ছাত্র-ছাত্রীরা কোথায় যাবে এরপর? প্রশ্ন জটিল হলেও উত্তর অনেক সহজ আমাদের এই দেশে। একেবারে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে ডিগ্রী দিয়ে দেয়া হচ্ছে অনায়াসেই। গ্রাম থেকে এসে এভাবেই প্রতারিত হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী। আমাদের উচ্চ শিক্ষা আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। পাবলিক ইউনিভার্সিটি নতুন হয়েছে অনেকগুলো কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা এবং মান আরো বাড়াতে হবে। এবং হাতে গোনা দশটি ইউনিভার্সিটি ছাড়া বাকি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর অবস্থা খুবই জঘন্য। কিন্তু ঠিক ঠিক ই দেখা যাচ্ছে চার বছরের মধ্যে ডিগ্রী দিয়ে দিচ্ছে। আর অন্য দিকে আছে জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয় যার অধীনে কয়েক লক্ষ্য ছাত্র পড়াশুনা করছে , তার মান উন্নয়ন এর দিকেও কোনো খেয়াল নেই সরকার এর। অনেক বার বলা হলো বিভাগ অনুযায়ী ভাগ করে দেয়া হোক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে। তাতে করে এর মান এবং সেবা দুটোই বাড়বে কিন্তু নানা জটিলতায় সেটাও সম্ভব হলো না।এভাবে কী পাব আমরা? হয়ত শিক্ষার হার বাড়বে কিন্তু আমরা শিক্ষিত মানুষ পাব না। দেশ হারাবে তার প্রাণশক্তি।তাই আধুনিক শিক্ষা নীতি প্রণয়ন আজ সময়ের দাবি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর গবেষণা কাজে মনোনিবেশ খুবই প্রয়োজন। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া বন্ধ করতে হবে, পুরনো গুলোর মান উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কি এবং কারা শিক্ষিত? এই প্রশ্নের উত্তরে ৯৯% বাংলাদেশী বলবেন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য একটা ভালো চাকুরী, অর্থাৎ কিনা বড় চাকর তৈরী হওয়া এবং এদেশের মানুষের ধারণা বড় ডিগ্রী মানে বেশি শিক্ষিত। কিন্তু এদেশে যাদের বড় ডিগ্রী থাকে তাদের ভিতরে শিক্ষার আলো খুব কম দেখতে যায় বরং যাদের ডিগ্রী নেই এমন অনেক মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো দেখতে পাওয়া যায়। এখানে একজন বড় ডিগ্রী প্রাপ্ত মানুষ অন্যের থেকে অবৈধভাবে অর্থ নিয়ে নিজের রোজগার বাড়ান, অন্যদের গবেষনাপত্র চুরি করে নিজের নামে প্রকাশ করেন, প্রাথমিক স্কুলের বাচ্চাদের মত অন্যের সাথে ঝগড়াঝাটি করে ট্রেন এ জায়গা দখল করেন। এমন শিক্ষিত মানুষও দেখা যিনি পান বা সিগারেট খেয়ে স্কুলের দেওয়াল বা পরিবেশ নোংরা করেন কিংবা বাস থেকে থুতু ফেলেন যেটা রাস্তায় চলমান মানুষের গায়ে গিয়ে পড়ে। পিতামাতার সম্পত্তি নিজের করায়ত্ত্ব করে পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে চালান করেন কিংবা সিঁড়ির নিচে ঢুকিয়ে দেন। ডাক্তাররা রোগীদের থেকে বেশি অর্থ রোজগারের চেষ্টা করেন। এগুলো প্রকৃত শিক্ষার নমুনা?

আজ পর্যন্ত কোন দার্শনিক কোথাও বলেন নি যে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য চাকুরী বা এইসব পাশবিক আচরণ। তাহলে বাংলাদেশীরা এটা শিখল কোথা থেকে? আসলে বহু বছর এদেশীয়রা অন্যের গোলামী করতে করতে গোলামী করাটা তাদের জন্মগত অধিকার বলে ধরে নিয়েছেন এবং গোলামী করতে করতে তাদের নীতি-আদর্শ সব জলাঞ্জলি গেছে। শিক্ষা স্কুল, কলেজ, বই এসব থেকে পাওয়া যায় না, শিক্ষা মানুষের ভিতর থেকে আসে। প্রকৃত শিক্ষার জন্য স্কুলে যেতে হয় না বা ডিগ্রী লাগে না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিত্ত্বকে বিকশিত করে এবং সঠিক আচরণ করতে শেখায়। যে মানুষের ডিগ্রী থাকা সত্ত্বেও আচরণ ঠিক নেই সে মানুষই নয়। সুতরাং ডিগ্রী থাকুক বা নাই থাকুক নিজেকে প্রকৃত মানুষ তৈরী করাটাই হল শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যাতে সে সমাজের জন্য কল্যানকর হয়ে উঠতে পারে নাহলে সারাজীবনের সব পরিশ্রম জলে যাবে। তাই বলতে পারি “পরিমাণে নয় মানেই জাতির পরিচয় ” আমরা পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে মান বাড়ানোর দিকে জোর দিব সেটাই হোক আমাদের কামনা।

 

লেখক: সাংবাদিকতা, যোগাযোগ এবং মিডিয়া স্টাডিস, বরেন্দ বিশ্বদ্যালয়, রাজশাহী।

Comments

comments