সুত্রপাত / সম্পাদকের কলম / পঞ্চাশ টাকার জন্য ‘দেহ বিক্রি’
Laboni

পঞ্চাশ টাকার জন্য ‘দেহ বিক্রি’

লাবণী মন্ডল:

ফুটপাত! এই ঢাকা শহর জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ফুটপাত। যে ফুটপাতে বাস করে কত হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ! তার জরিপ আমার কাছে নেই- হয়তো সঠিক জরিপ কারো কাছেই নেই। প্রতিদিনই হেঁটে চলি ফুটপাতে। কত মানুষ, কত রংবেরঙের মানুষই না দেখি! দেখতে বাধ্য! কখনো এড়িয়ে যেতে চাই, কখনো চোখ আটকে যায়। কখনো থমকে দাঁড়াই, কখনো স্পিড নিয়ে হেঁটে পালাই। পল্টন আমার অফিস। পল্টনের আশেপাশের ফুটপাতে কতশত ছিন্নমূল মানুষ থাকে- তার হিসেব না থাকলেও এদের জীবনযাত্রা দু’চোখ দিয়ে দেখি, অবলোকন করি। পল্টন-প্রেসক্লাব-হাইকোর্ট হয়েই যাতায়াত। পায়ে হেঁটে চলি। হাইকোর্টের সামনের ফুটপাত জুড়ে রয়েছে মানুষের মেলা। খাবার বিক্রি হয়, ফুল বিক্রি হয়, পান, চা সব- এবং কি মানুষও বিক্রি হয়। রাত বারোটার পরই তারা হয়ে উঠে দুর্ধর্ষ চরিত্রের মানুষ। এর আশেপাশে ট্রাফিকগুলোও ঠিক একই চরিত্র ধারণ করে। পরিবেশ ওদেরকে ঠিক মানিয়ে নিয়েছে কিংবা ওরা পরিবেশকে মানিয়ে নিয়েছে। না নিয়ে উপায়টা কি! পুরো দেশ জুড়েই তো এ অরাজকতা, অস্থিরতা!

এই ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে কখনো ইভটিজিংয়ের শিকার হই, কখনো গায়ে অনাকাক্সিক্ষতভাবে হাত এসে পড়ে। কখনো প্রতিবাদ করি, কখনো হেঁটে চলে যাই। হাইকোর্টের ফুটপাত নিয়ে আমার বেশ প্রশ্ন জাগে! এরকম একটা হাইকোর্টের সামনে এরকম অবস্থা! কেউ কি দেখার নেই, কারো কিছু যায় আসে না! খুব স্পষ্টভাবেই জানি, এদেরকে এখানে শুতে, বসতে দিয়েছে একশ্রেণীর অসাধু মানুষ। পুরো ঢাকাশহরের চিত্রই ঠিক তাই।  যাহোক, মূল কথায় আসি। এই তো কিছুদিন আগে হাইকোর্ট পার হয়ে শিশু একাডেমীর সামনে যেতেই এক বারো কি তেরো (ওদের বয়স অনুমান করা কঠিন) বছরের এক তরুণী এসে সামনে দাঁড়ালো। দেখতে খুব সুন্দরী। সুন্দরী বলতে যা বোঝায়। ছিমছাম চেহারা, গায়ের রং শ্যামলা, দাঁতগুলো ফকফকে। চুলগুলো এলেমেলো। গায়ে কোনো রকমে ওড়না জড়ানো। সামনে এসেই বললো, ‘আফা জামা-কাপড় দিবেন কয়টা?’ প্রশ্নটার উত্তর না দিয়েই প্রশ্ন করলাম-তোমার নাম কি?
পারুল।

আচ্ছা, দিবো জামাকাপড়। কাল নিয়ে আসবো। তুমি সাড়ে দশটায় হাইকোর্টের সামনে থেকে। এ পথেই যাবো আমি। এ কথা বলেই হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটছি আর ভাবছি। কি অদ্ভুত পৃথিবী! একশ্রেণীর জামাকাপড় রাখার জায়গা নেই, আরেকশ্রেণী খাবার অভাবে মরে, কাপড়ের অভাবে থাকে! মনটা স্থির করতে পারছিলাম না। চেতনার আয়নায় বারবার ওর প্রতিচ্ছবি ভেসে আসছে। এর আগে যখন কাঁটাবন চাকরি করতাম- এক প্রতিবন্ধী পরিবার কাঁটাবনের ফুটপাতে থাকতো। ওদের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। কাপড় দিতাম, খুব অল্পপরিমাণে টাকাও দিতাম। রাস্তায় দেখলে সবার সামনে জড়িয়ে ধরতো বাচ্চাটা। এতে বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই বিব্রতবোধ করতো। সেই পরিবারটির সাথে আর দেখা হয় না। ওরা কত আন্তরিক মানুষ! ওরাই আবার কত দুর্ধর্ষ! সবকিছুর মূলে এই সামাজিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। ভাবতে ভাবতে ভাবনার জগতে প্রবেশ করে ধূর! আমার কেউ তো ফুটপাতে থাকে না। এই বেশ ভালো আছি! চাকরি করি, মাস শেষে মাইনে পাই। ভালোই তো আছি, এতো কিছু ভাবতে গেলে এদেশে পাগল হওয়া ছাড়া উপায় কি!

ঠিক, পরের দিন কিছু সালোয়ার-কামিজ নিয়ে হাজির। পারুল খুব আগ্রহভরে সেগুলো গ্রহণ করলো। ‘আফা ভালো থাকবেন বলে, ফিক করে হেসে দিল। আশেপাশের কয়েকজন বললো, ‘আফা আমাদেরকেও দিয়েন। আমি খুব স্পষ্টভাবে বললাম, আপনাদের জন্য কতজনে কত কিছু নেয়- যেমন: ধরেন এনজিও গুলো, মানবাধিকার নেতাকর্মীরা। বিদেশ থেকেও কত টাকা আনে। শিশুদের জন্য, ফুটপাতের আপনাদের জন্য। দেয় না কিছু? খুব কমই তো দেয় আফা, যা আনে তা কি দেয়! বাহ্, কত সত্য কথা বলেন ওনারা। ঠোঁটের ফাঁকে এক চিলতে হাসি নিয়ে পথ চলা শুরু করলাম। আবারও ভাবতে শুরু করলাম- হু কতটুকুই বা ওদের দেয়! ৫০ টাকা পেলে ১০ টাকা দেয়, বাকিটা নিজেদের পকেটে ভরে। এর আগে কত প্রতিবেদনেই তো প্রকাশ পেল। ওদের এসব কর্মকাণ্ডে। এই ফুটপাতের মানুষের টাকা দিয়ে ওরা দালানা ওঠান, প্লট কিনে, ফ্লাট কিনে। বাহ্! চমৎকার। বাহারী চরিত্রের মানুষ! এ সবই পুঁজির খেলা। পুঁজি তো মানুষের চিন্তাই কিনে নিয়েছে। পুঁজির বাহিরে কিছু ভাবা যে আজকাল বড় দায় !

এভাবেই চলছে ফুটপাতবাসীদের জীবনযাপন। কখনো উচ্ছেদ, কখনো পুড়িয়ে দেওয়া, কখনো চুরি করে ওদের অল্প সম্পদও। দু’তিনদিন পরেই হাইকোর্টের সামনে আসতে দেখিই- পারুল হাউমাউ করে কাঁদছে। পাশে লোকজন চোখ টিপছে, কেউ পান চিবুচ্ছে, সিগারেট ফুকছে, কেউবা ওকে টিজ করছে। কারো দিকে কারো কোনো নজর নেই। পারুল কাঁদছে তো নামার নামমাত্র নেই। থমকে যাই। একবার না চলে যাই, আবার কি যেন ভেবে থমকে যাই। ওর পাশে গিয়ে বলি- কি হয়েছে তোমার পারুল? খুব রাগতস্বরে, বলে উঠলো আমার পঞ্চাশ টাকা না দিয়ে চলে গেছে, এখন শূয়োরটাকে কই পাবো?

কিসের পঞ্চাশ পারুল? ইতোমধ্যে বেশ ক’জন পথচারীও জমে গেল। পাশ থেকে এক বয়স্কা মহিলা বলে উঠলেন, ‘ক্যান মাগী আগেই তো বলছিলাম, ওই ব্যাটা ভালো না? ওর লগে যাবি না, ও তোরে টাকা দিবো না! গেলি ক্যা!’ একেবারে কানে কথাগুলো এখনও বাজছে, বিশ্বাস করুন আর না করুন- একদণ্ডও বাড়িয়ে বলছি না। আমি আপ্লুত, একেবারেই আবেগঘন মুহূর্ত। চোখের জল আমার পক্ষে আটকে রাখা সম্ভব হয় নি। কিছু না বলেই হাঁটতে শুরু করি। বুঝতে আর বাকি থাকে না- ‘ওরে কেউ পঞ্চাশ টাকার কথা বলে দেই নি, ওর দেহটাকে কেউ ভোগ করেছে- কাল রাতে। বলেছিল, পঞ্চাশ টাকা দিবে! কিন্তু দেই নি! তখনও কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি, কখনো জোরে জোরে, কখনো বকাবকির সাথে কান্না করছে। কান্নার আওয়াজ পাড়ি দিয়েই আমার শিশু একাডেমী, দোয়েল চত্বর পার হওয়া হলো।

পঞ্চাশ টাকার জন্য! দেহ বিক্রি! এই মধ্যম আয়ের দেশে! পারুলরা কি দোষ করেছিল! এই সমাজে জন্ম নিয়ে! প্রশ্ন উঠতেই পারে- এর দায় ওদেরই, ওরাই এরকম জীবন বেছে নিয়েছে। আমি কিন্তু এত সরলভাবে ভাবতে পারছি না। কেনো এর দায় শুধু ওদের হবে? এই সমাজের কেউ কি দেখার নেই? দেখারই বা থাকবে কি করে? বহু আগে একটা প্রতিবেদনে পড়েছিলাম- ‘ফুটপাতের তরুণীরা রেহাই পায় না ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকেও।’ তারা রেহাই পায় না- ওই এলাকার চ্যালাচামুণ্ডার লোভাতুর পুরুষত্ব থেকে। তাদের টগবগে যৌবনবতী শরীরে যেকেউ বীর্য ঢেলে দিতে প্রস্তুত। কত পুরুষই যে তাদেরকে ভোগ করে! কতভাবে উসলিয়ে, ফুসলিয়ে!

লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক।

Comments

comments

error: Content is protected !!