সুত্রপাত / রাজ্যের যুক্তি-তর্ক / নষ্ট হয়েছে ছাত্র রাজনীতি, প্রত্যাশা ছাত্র সংসদের

নষ্ট হয়েছে ছাত্র রাজনীতি, প্রত্যাশা ছাত্র সংসদের

শরিফুল হাসান সমাপ্ত:

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে চলছে ভয়াবহ সিডর। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্র সংসদ নেই। অতি সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও প্রধান দুই দলের ছাত্র সংগঠনের আন্দোলনের ফলে সে পদক্ষেপ ভেস্তে গেছে। গত ২১ মার্চ ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘ডাকসু’র নির্বাচন চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষার্থী। ৮ এপ্রিল প্রাথমিক শুনানি শেষে সুনির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু কোনো সারা মিলেনি।

যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা। রোহিঙ্গা, রামু, উখিয়া, পটিয়া হামলাকারীদের বিচার, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করাসহ নানাবিধ উন্নয়ন কর্মকান্ড এখন সরকারের যেমন প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অপরদিকে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, খুন, গুম বন্ধ, দলের নেতকর্মীদের হয়রানি মামলা প্রত্যাহারসহ নানাবিধ আন্দোলন সংগ্রামে সোচ্চার হচ্ছে। এমনি মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে গতিশীল নেতৃত্ব, ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা, সামাজিক সাংস্কৃতিক ধর্মীয় কর্মকান্ড, বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু করা ও ছাত্র-ছাত্রীদের এখন প্রধান আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সমন্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘ডাকসু’সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘ডাকসু নির্বাচন চাই’ লেখা সম্বলিত পোস্টার, প্রচারপত্র, সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদী চিত্রাঙ্কন, প্রতিবাদী সঙ্গীতানুষ্ঠানসহ নানাবিধ কর্মসূচি পালন করছে।

এ দেশের বিভিন্ন গণমুখী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সংগঠনগুলো ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। অথচ দীর্ঘকাল ধরে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নেই। এটা সত্যিই দুঃখজনক। আর কেনই বা ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না, কর্তৃপক্ষ কেনই বা এ ব্যাপারে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে এটা আমাদের বোধগম্য নয়।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই ছাত্র রাজনীতি গড়ে উঠে। আর এই ছাত্ররাই বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অতীতে ও বর্তমানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ ধাপে ধাপে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আর এ আন্দোলন সংগ্রামে সব পর্যায়েই বাঁধভাঙ্গার কাজটি করেছে ছাত্র সমাজ। যার নেতৃত্বে থেকেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘ডাকসু’ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন ও জনমানসে তা প্রোথিত করার কাজে বরাবরই অগ্রসৈনিক ছিল ছাত্র সমাজ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ঐতিহাসিক কারণেই ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন ও এই বছরের ৭ জুনের হরতাল, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী আন্দোলনই ছিল এককভাবে ছাত্রলীগের আন্দোলন। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও বৃহত্তর পরিম-লে এ সমস্ত আন্দোলনে শরীক হতে থাকে। ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৬, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭০-এর প্রতিটি বছর চিহ্নিত হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মাইলফলক হিসেবে। আর সব পর্যায়ে ‘ডাকসু থেকেছে কেন্দ্রবিন্দুতে।

ডাকসু : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন হল শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ডাকসুর কার্যক্রম শুরু হয়। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে।

জাকসু : ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘জাকসু’ গঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে সর্বশেষ জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

রাকসু : ১৯৫৭ সালে তৎকালীন উপাচার্য ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী ১৫ সদস্য বিশিষ্ট ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে। সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে।

চাকসু : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)-এর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সাল থেকে দেশের ১৩ হাজার ৫৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছোট বেলা থেকেই ছাত্র নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষে ছাত্র কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য প্রত্যক্ষ ভোটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের যুগান্তরকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী সরকার ও সংশ্লিষ্ট কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিলে সুনির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে তাতে যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে এবং হাইকোর্টের প্রতি সম্মানও প্রদর্শন করা হবে। ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ফিরে পাক তাদের হারানো ঐতিহ্য এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী মহানগর, সামাজকল্যাণ ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, রাজশাহী জেলা ।

Comments

comments