নষ্ট টিউবলাইট

//নষ্ট টিউবলাইট

নষ্ট টিউবলাইট

শাশ্বতী বিপ্লব:

বাথরুমের টিউব লাইটটার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে সিথি। চারদিন ধরে এই ফাইজলামীটা চলছে ওর সাথে। সুইচ অন করলে ক্রমাগত জ্বলার চেষ্টা করতে থাকবে, কিন্তু জ্বলবেনা কিছুতেই। এই কারণে টিউবলাইট জিনিসটাই সিথির পছন্দ না। তারচেয়ে এনার্জি বাল্ব অনেক ভালো। কিন্তু বাল্ব লাগানোর কোন অপশন নাই এই বাথরুমে। মোহনকে কয়েকবার বলেছে নতুন একটা টিউব লাইট কিনে আনতে। মোহন সে কথা কানে তুললে তো। আর তুলবেই বা কেন? মোহন এসে জ্বালালে ঠিক দপ করে জ্বলে উঠছে পাজি লাইটটা। কিন্তু সিথির বেলাতেই মোটে কাজ করছে না। মোহন বলেছে, আরে ভোল্টেজের ফ্লাকচুয়েশনের কারনে এমন হচ্ছে। লাইটের কিছু হয়নি। কিন্তু ভোল্টেজ কেন শুধু সিথির বেলাতেই ফ্লাকচুয়েট করছে সেটার কোন উত্তর মোহন দেয়নি।

সিথি বিরক্তি নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। হাতে পায়ে লোশন লাগাতে লাগাতে ভাবে কাল নিজেই লাইটটা বদলে দেবে। ড্রাইভারকে টাকা দিলেই কিনে এনে দেবে। এই লাইটটার কারনে সিথির অসুবিধা লাগে, কিন্তু মোহন সেটাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। সিথিও মোহনকে আর অনুরোধ করবে না ঠিক করলো।

বেডরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং এ এসে সিথি দেখে টেবিলে খাবার রেডি। বুয়া টেবিলে সব সাজিয়ে রেখে চলে গেছে। আর মোহন টিভির রিমোট হাতে সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদু নাকও ডাকছে। ডাইনিং আর ড্রইং রুমের মধ্যে কোন আড়াল নেই। ডাইনিং এ দাঁড়িয়ে মোহনের গাঢ় নিঃশ্বাসের ছন্দময় উঠানামা বেশ বোঝা যাচ্ছে। সিথি মোহনের এই যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ার ক্ষমতাটাকে ঈর্ষা করে। কি নিশ্চিন্ত সুখী একটা মানুষ! জগৎ সংসারের কোন চিন্তাই মোহনের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। অথচ সিথি চোখে রাজ্যের ঘুম নিয়েও রাতের পর রাত জেগে থাকে। খুব এক বিচ্ছিরি অনুভূতি।

সিথি ড্রইংরুমে গিয়ে আস্তে করে মোহনকে ডাক দেয়। যেনো চমকে না ওঠে সে কারণে গায়ে হাত দিয়ে আলতো ধাক্কা দেয়, মোহন, এই মোহন। ঘুমিয়ে পড়লে যে, খাবে না? ওঠো। মোহন ঘুম ঘুম চোখ মেলে হাসে। বলে, কই ঘুমালাম? আমিতো জেগেই আছি।

এ নিয়ে মোহনের সাথে তর্ক করা বৃথা, সিথি সেই চেষ্টাও করে না। মোহন কিছুতেই স্বীকার করবে না ঘুমের কথা। সিথি বলে, আচ্ছা বেশ। ঘুমাও নাই তুমি। এবার খেতে আসো। দুজনে মিলে খেতে বসে। কিন্তু আজ খাবার টেবিলে গল্প জমে না। সিথি শুধু হু হা করে যায়। মোহন বলে, এই তোমার কি হয়েছে বলতো? অফিসে কোন সমস্যা?

সিথি : আরে নাহ্। অফিসে আবার কি হবে?

মোহন: তবে কথা বলছো না কেন? কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আছো।

সিথি: কিছু না। এমনি। আসলে বাথরুমের লাইটটা আজো জ্বললো না। শুধু আমার বেলাতেই
কেন এমন হচ্ছে বলতো? মেজাজটা খারাপ হয়ে আছে।

মোহনও এবার একটু বিরক্ত হয়। বলে, তুমি পারোও বাবা। একটা সামান্য লাইটের কারণে…অদ্ভুত!!

সিথি কিছু বলে না। ও জানে ও অদ্ভুত আচরণ করছে। সামান্য লাইটের জ্বলা না জ্বলা নিয়ে এতো রিএ্যাক্ট করার কিছু নেই। কিন্তু আলো আধারীতে শরীরে এক অদৃশ্য স্পর্শের অনুভূতি ও মাথা থেকে বের করতে পারে না কিছুতেই। মোহনকে সেটা বলতেও
ইচ্ছা করে না। কি বুঝতে কি বুঝবে তার ঠিক নেই। খামোখা অশান্তির একটা খোরাক জুটবে। পরদিন সিথি ড্রাইভার কামালকে দিয়ে একটা নতুন লাইট কিনিয়ে রাখে, কিন্তু লাগায় না। ভাবে, সত্যি হয়তো ভোল্টেজের ওঠানামার কারণেই এমন হচ্ছে। আর শুধু ওর বেলায় হওয়াটা নিতান্তই কাকতালীয় হবে। শুধু শুধু বাড়াবাড়ি না করে আরেকদিন দেখার সিদ্ধান্ত নেয়।

অফিস থেকে ফিরে রান্নাঘরে একবার উঁকি দেয় সিথি। বুয়াকে একটু চা করতে বলে বেডরুমে এসে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। মোহন এখনো ফেরেনি, জাহাঙ্গীর গেটের কাছে জ্যামে আটকে আছে। তারমানে ফিরতে দেরী হবে। সিথির বাথরুমে যাওয়ার চাপ বাড়তে থাকে। তবুও সেটাকে উপেক্ষা করে বিছানায় জোর করে শুয়ে থাকে। গতকালের অস্বস্তিটা মনে খচ খচ করছে। বাথরুমটাতে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। যদিও জানে, পুরোটাই ওর মনের ভুল। নাহ্,  বেশিক্ষণ পারা গেলো না। নিজেকে মনে মনে একটা কড়া ধমক দিয়ে ঘরে পরার ট্রাউজার আর টপটা নিয়ে সিথি ঢুকে যায় বাথরুমে। একবারে একটু গা ধুয়ে বেরুবে। খুব ধকল গেছে আজকে।

টিউবলাইটটা আবারও জ্বলি জ্বলি করেও জ্বলছে না। সিথি সেটা পাত্তা না দিয়ে শাওয়ার ছেড়ে বাথটাবে দাঁড়িয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে ঠান্ডা পানির স্রোতে ভিজতে ভিজতে লাইটের দপদপদনীর কথা ভুলে যায় একেবারে। ক্লান্তি ধুয়ে যেতে থাকে পানির
ধারার সাথে। সিথি গুন গুন করে গেয়ে ওঠে, জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো।

হঠাৎ গায়ে সেই হাতের স্পর্শটা আবার অনুভব করে সিথি। হাতটা ধীরে ধীরে ওর সারা গায়ে ঘুরছে। সিথি চিৎকার করে উঠতে চায়। কিন্তু আরেকটা হাত ওর মুখ চেপে রাখে। হাতগুলোর শক্তির সাথে ও কিছুতেই পেরে উঠে না। যতই ছুটতে চেষ্টা করে, ততই
হাতটা ওকে জাপটে ধরে রগড়াতে থাকে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে থাকে, চুপ চুপ। অমন করে না সিথি। একটু চুপ করে থাকো সোনা। দেখো তোমার ভালো লাগবে। সিথি চমকে ওঠে, এটা তার মনু মামা না? মামা কখন এসেছে? মনু মামা বলে চলেছে, মামা তোমাকে কত্ত আদর করি বলো? তোমাকে চকলেট কিনে দেই, গল্পের বই কিনে দেই। এবারো তোমাকে
বইমেলায় নিয়ে যাবো। আরো বই কিনে দেবো লক্ষী। তুমি শুধু একটু আমাকে আদর করতে দাও। তোমারও ভালো লাগবে। প্লীজ, প্লীজ সিথি। আমি তোমাকে একটুও ব্যাথা দেবো না। প্রমিজ বলছি।

সিথি নিরুপায় হয়ে শাওয়ারের পানিতে ভিজতে ভিজতে ধর্ষিত হতে থাকে। মনু মামা একপর্যায়ে সিথির মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলে, বড়পা বাসায় নেই, চিৎকার করো না, কেমন? তারপর, বাথটাবের উঁচু জায়গাটায় কায়দা করে বসে সিথিকে কোলে তুলে নেয়।

সিথি চিৎকার করে না, কাঁদেওনা একটুও। মনু মামা বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। কি করবে বুঝতে পারে না। মনুমামা মায়ের খুব প্রিয় ভাই। তারও খুব প্রিয় মামা। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, হলে থাকে। প্রায়ই বোনের বাসায় বেড়াতে আসে। কিন্তু সেটা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। অন্যান্য দিনে মামা আসতে পারে না। ক্লাস থাকে, টিউশনী থাকে। তারউপর আবার শায়লা আন্টিকে সময় দিতে হয়। শায়লা আন্টি মনু মামার সাথেই পড়ে। ওরা বিয়ে করবে সিথি জানে। শুধি সিথি না, সবাই জানে। এটা ওপেন সিক্রেট। শায়লা আন্টি কয়েকবারই এসেছে ওদের বাসায়।  সিথিকে খুব আদর করে শায়লা। আজ মামা অসময়ে এসেছে বাসায়। সিথির মা সিথির ছোটভাইটাক স্কুল থেকে আনতে যাবে তখন। মনুকে দেখে বলে গেছে, তুই একটু বোস তাইলে, আমি চট করে বাবুকে নিয়ে আসি। এসে একসাথে সবাই ভাত খাবো। সিথি গোসল করছে। বের হলে বলিস।
বাথরুমে থাকায় এসব কিছুই সিথি টের পায়নি। বাথরুমের দরজায় টোকা পড়তে সিথি ভেবেছিলো মা কিছু চাইছে। কিছু না ভেবেই “কি আম্মু?” বলে শোনার জন্য দরজাটা একটু ফাঁক করতেই মনু মামা ঠেলে ঢুকে পড়েছে।

এইসব কথা পৃথিবীর কাউকে বলেনি সিথি, কেউ জানে না। কেন বলেনি সেটা ওর নিজের কাছেও পরিস্কার না। কিন্তু মাথার ভেতর সেই অভিজ্ঞতাটা প্রেতাত্মার মতো নখ গেড়ে বসে থাকে সিথির। জ্বলতে নিভতে থাকা টিউবলাইট একদম সহ্য করতে পারে না ও। সেদিনও টিউব লাইটটা এমন নষ্ট ছিলো। এরকমই দপ দপ করে জ্বলছিলো আর নিভছিলো।

সিথি বাথটাবে দাঁড়িয়ে বোবায় ধরার মতো গোঙাতে থাকে। প্রাণপণে শরীর থেকে হাতগুলো সরাতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই সরাতে পারে না। বাইরে থেকে বাথরুমের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা পড়ছে। সাথে মোহনের চিৎকার, সিথি, সিথি, কি হয়েছে? কথা বলছো না কেন? এই সিথি, দরজা খোল, সিথি, সিথি।

সিথি সম্বিত ফিরে পায়। হঠাৎ করে হাতগুলো সরে যায় গা থেকে। টিউব লাইটটা এখনো জ্বলছে নিভছে। অবসন্ন কন্ঠে সিথি বলে, কিছু হয়নি। এই আসছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে মোহনের প্রশ্ন আর উদ্বিগ্ন দৃষ্টি উপেক্ষা করে সিথি হাসার চেষ্টা করে। বলে, ওহ্, তুমি চলে এসেছো? খুব ট্রাফিক ছিলো আজকে, না? তারপর বুয়াকে ডাকে জোরে। বুয়া, চা দিলানা? বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

মোহনকে কিছুতেই বুঝতে দেয়া যাবে না। কিছুতেই না। মোহন বিষয়টা বুঝতে পারবে এমন ভরসা সিথির নেই। বরং খুঁটিয়ে খু্টিয়ে জিজ্ঞেস করে ওকে পাগল করে তুলবে। আর কোন কারণে ঝগড়া লাগলে তো কথাই নেই। এমনিতেই সিথির আত্মীয় স্বজন নিয়ে মোহনের অনেক নেগেটিভ অবজারভেশন আছে। তারচেয়ে একটা মিস্ত্রী ডেকে এনে একটা বাল্বের পয়েন্ট আর হোল্ডার লাগিয়ে নেবে বরং। টিউবলাইট আর জ্বালানোরই দরকার নেই।

শেয়ার করুন
  • 107
    Shares
By | ২০১৮-০৫-১৮T১৩:৫৯:২২+০০:০০ ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮|গল্প অথবা উপন্যাস|Comments Off on নষ্ট টিউবলাইট