সুত্রপাত / রাজ্যের যুক্তি-তর্ক / দ্বন্দ্বের প্রধান দিক: অস্তিত্ব রক্ষার এবং অস্তিত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্র
মারমা

দ্বন্দ্বের প্রধান দিক: অস্তিত্ব রক্ষার এবং অস্তিত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্র

উথোয়াইনু মারমা:
১.
প্রথমত, আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী? বাংলাদেশ স্বাধীনতার লাভের পর ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রাক্কালে সংবিধানে সাংবিধানিকভাবে বাঙালিকরণ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাঙালি জাতির ব্যতীত বাংলাদেশের অপরাপর জাতিরও বসবাসরত রয়েছে তথা ম্রো, খেয়াং, খুমি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া ইত্যাদি। সাংবিধানিকভাবে বাঙালিকরণ মানে বাঙালির জ্যাতভিমান, উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িক বহিঃপ্রকাশ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তারপর ওয়াক আউট করেন। অর্থাৎ আদিবাসী জাতিসমূহের অস্তিত্বকে ধ্বংস প্রক্রিয়া প্রথম পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, ১৯৭২ সালে ২৪ এপ্রিল সংবিধান প্রণয়নের সময় তৎকালীন গণপরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনেরর চার দফা দাবিনামা তূলে ধরেছিলেন খসড়া সংবিধান প্রণেতাদের নিকট। সংবিধান প্রণেতারা দাবিগুলো কোনো বিষয়ই তাদের আমলে আনেনি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ৪ দফা দাবিগুলো নিয়ে দেখা করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। কিন্তু এই দাবিগুলো বঙ্গবন্ধু কোন পাত্তাই দিলেন না। তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ধমক দিয়ে বলেন, “যা তোরা বাঙালি হইয়া যা।”

এই কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠেন। তুড়ি তুড়ি মারতে মারতে বঙ্গবন্ধু এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, চার লাখ, পাঁচ লাখ……দশ লাখ পর্যন্ত গুণে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বলেন, প্রয়োজনে দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব। তোরা সংখ্যায় পাঁচ লাখ। প্রয়োজনের দ্বিগুণ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব পার্বত্য চট্টগ্রামে। তখন কি করবি? যে আচরণ করা হলো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সঙ্গে, এর ব্যাখ্যা কী? হুমকি তো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। “বাঙালি হয়ে যা” বা “বাঙালির ঢুকিয়ে দেয়া” – এগুলো কোন গণতন্ত্রের ভাষা? অর্থাৎ আদিবাসী জাতিরসমূহের অস্তিত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বহিঃপ্রকাশ। তৃতীয়ত, ১৯৭২ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটিতে একটি বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আজ থেকে আমরা সবাই বাঙালি। এখানে কোনো উপজাতি নেই।” তৎকালীন সরকার পাহাড়ীদের সঙ্গে যে আচরণ করে সেটা পর্যালোচনার করলে স্পষ্ট যে, আদিবাসী জাতিরসমূহের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া।

২.
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু স্ব-পরিবারসহ হত্যা মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। শুরু সামরিক শাসন। ১৯৭৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকির বাস্তবায়ন শুরু করলেন জিয়াউর রহমান। লক্ষ্য লক্ষ্য বাঙালিকে নিয়ে বসালেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই বাঙালিদের দখল করে দেয়া হলো পাহাড়ীদের জায়গা-জমি-বাড়ি। এখানেও স্পষ্ট যে, পাহাড়ীদের সংখ্যালঘুকরণ মাধ্যমে পাহাড়ীদের অস্তিত্ব ধ্বংস করা বা নিশ্চিহৃকরণ প্রক্রিয়ার। তারপর থেকে চলতে থাকে সেনাশাসন। অপারেশন দাবানল নামে পাহাড়ে জুম্মদের সাম্প্রদায়িক হামলা, নারীদের ধর্ষণ, গণহত্যা, জুম্মদের বাড়ি লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, অপহরণ ইত্যাদি সেনা-সেটেলার বাঙালি কতৃর্ক পাহাড়ীদের ওপর নির্যাতন, শোষণ। নিরাপত্তা অজুহাতে ক্যাম্প সম্প্রসারণ, ভূমি বেদখল ইত্যাদি। জেনারেল জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ওপর নির্যাতন করেছেন অমানবিকভাবে। তার সময়েই জালাও – পোড়াও, হত্যা, ধর্ষণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এই অপকর্মটি করেছে সেনাবাহিনী। তারপর জেনারেল এরশাদ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এরশাদ সরকার প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা বলে স্বীকার করে এবং আলোচনা আহবান জানান। এরপর জেনারেল এরশাদ শান্তিবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার শুরু করেছিলেন কিন্তু পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের প্রক্রিয়াটি অব্যাহতই রেখেছিলেন।

এরশাদ বাংলাদেশকে ইসলামীকরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় সংবিধানের রাষ্ট্র ধর্ম যোগ করে। এরপর খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে আলোচনার অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু সেনাবাহিনী নির্যাতন কমেনি পাহাড়িদের ওপর। এরপর শেখ হাসিনার সময়ে এসে চুক্তি হয়েছে। অর্থাৎ এরশাদ সরকার সঙ্গে ১৩ বার, বিএনপি সরকার সাথে ৭ বার, আওয়ামী সরকার সাথে ৬ বার আলোচনার বসার পর চুক্তির স্বাক্ষরিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে রক্ত পিচ্ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণ তথা সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পার্বত্যবাসী অধিকার সনদ এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অর্জিত হয়েছিল। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার সনদ। পার্বত্য চুক্তির আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনে একটি রূপ। জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি রূপ। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার একটি রূপ। অস্তিত্ব রক্ষার একটি রক্ষাকবচ।

৩.
আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য সরকারিভাবে যতই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলুক, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজী আখ্যায়িত করুক। পাহাড়ীরা মনে করে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করে না, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজী করে না। তারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে একটি নিষ্পেষিত নির্যাতিত-বঞ্চিত জুম্ম জাতির মুক্তির জন্য আন্দোলন করছে। এটা জুম্মদের জাতীয় মুক্তির আন্দোলন। ৭১ – এ বাংলাদেশ কাছে মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানদের কাছে তা ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। ইংরেজী “6” দু’পাশে থেকে দেখলে একজনের কাছে “ছয়” আর একজনের কাছে নয়। এভাবে প্রতিটি বিষয়েরই বিপরীতভাবে হয়ত ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

যতই ব্যাখ্যাই দেয়া হোক না কেন, পাহাড়ি জাতির সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশ সরকার সম্মান দেখাতেই হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে সন্তু লারমা বলেন, “বাংলাদেশকে যদি বিশ্ব দরবারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে হয় তাহলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। সম্মিলিতভাবে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। সরকার চায় চুক্তি বাস্তবায়নের এই আন্দোলন ধ্বংস হোক এবং পাহাড়ীদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাক। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং অধিকার আদায়ের জন্য শুধু পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণই নয়, জাতীয়ভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”

সরকার চায় জুম্মদের অস্তিত্ব ধ্বংস হোক। অর্থাৎ চুক্তির বাস্তবায়নের আন্দোলনকে ধ্বংস করার মানে আমাদের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার সমান। জুম্মরা চায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আত্মিনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার করতে, অধিকার প্রতিষ্ঠার করতে। অর্থাৎ অস্তিত্ব রক্ষার এবং অস্তিত্ব ধ্বংস ষড়যন্ত্র প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে দাড়িয়েছে। যা বৈরী দ্বন্দ্ব। প্রধান দ্বন্দ্ব প্রভাবে ফলে আরো অনেক অপ্রধান দ্বন্দ্বও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের চারিপাশে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমান তিন মৌলিক সমস্যা হচ্ছে সেনা শাসন, ভূমি সমস্যা এবং সেটেলার বাঙালি। এখানে একটি সমস্যা সাথে আরেকটি সমস্যা সম্পর্কিত। একটি উদ্ভবের ফলে আরেকটি উদ্ভব হয়।

আমাদের চারিপাশে ঘটে চলা সমস্যা হচ্ছে : অপারেশন উত্তরণ অজুহাতে সেনা শাসন অব্যাহত রাখা। যা পার্বত্য চুক্তি’র লঙ্ঘন। নিরাপত্তার অজুহাতে সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারণ অর্থাৎ ক্যাম্প সম্প্রসারণ নামে ভূমি বেদখল। লাশ নিয়ে রাজনীতি। অর্থাৎ লাশকে ঘিরে বাঙালিরা জুম্মদের গ্রামে লুটপাট এবং অগ্নি সংযোগ। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা-দাঙ্গামা। এগুলো করে বিভিন্ন প্রশাসনের ছত্রছায়া।

জুম্মদের ওপর গণহত্যা। এ পর্যন্ত ১৩ টি কিংবা ১৪টি। প্রতিনিয়ত ব্যবসা-বাণিজ্য নামে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বসতিস্থাপন। পর্যটন গ‌ড়ি আদিবাসী উচ্ছেদ ক‌রি এই নী‌তি‌তে রাষ্ট্র বি‌ভিন্ন নীল নকশা বাস্তবায়ন কর‌ছে, পর্যট‌নের দ্বারা আদিবাসী‌দের জীবন জী‌বিকা, বৈ‌চিত্র, সংস্কৃ‌তি সব কিছু কি রক্ষা হ‌চ্ছে না‌কি বিলীন হ‌চ্ছে, পর্যট‌নের দ্বারা কি আমরা কিছু পা‌চ্ছি না হারা‌চ্ছি?

পর্যটনকে ঘিরে যৌন ব্যবসা-বাণিজ্য। আদিবাসী নারীর ওপর লাভ জিহাদ তত্ত্ব প্রয়োগ, ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি। বিভিন্ন কোম্পানি, কর্পোরেট কতৃর্ক জোরপূর্বক ভূমি বেদখল। রাজনৈতিক ও ক্ষমতা প্রভাবশালী কতৃর্ক জোরপূর্বক ভূমিবেদখল। অর্থাৎ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকার তথা কতৃর্ক জোরপূর্বক ভূমিবেদখল। রিজার্ভ বন নামে বনভূমি দখল। উন্নয়ন নামে জুম্মদের ভূমি বেদখল। উন্নয়নের জুম্ম জাতিকে বিলুপ্তি করার ষড়যন্ত্র।

৮০ – দশকের পার্বত্য চট্টগ্রামে চার লাখ বাঙালি পূর্নবাসন। অঘোষিতভাবে বাঙালি ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল করার প্রক্রিয়ার । এগুলো সবই হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের উপর শাসকশ্রেণী পরিকল্পিত
“জাতিগত নির্মূলীকরণের নীতি” (Ethnic cleansing policy)। অর্থাৎ জুম্মদের অস্তিত্ব ধ্বংস কার্যক্রম। তবে এক কথা মনে রাখতে হবে, আমরা সেনাবাহিনী বিরুদ্ধে নয়, সেনা শাসন বিরুদ্ধে লড়ছি। বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি না,  উগ্রজাতীয়তাবাদ বিরুদ্ধে লড়াই করছি। লড়াই করছি চুক্তি বিরোধীদের বিরুদ্ধে, জুম্ম স্বার্থপরিপন্থীদের বিরুদ্ধে। জুম্ম জাতি চায় জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কাজ না করুক, দালালী না করুক, প্রতিক্রিয়াশীল না হোক। আমরা লড়ছি জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।

[তথ্যপঞ্জি: শান্তিবাহিনী গেরিলা জীবন; গোলাম মোর্তোজা।]

Comments

comments

error: Content is protected !!