জামায়াতী ইসলামের সাংগঠনিক ভিত্ত্বি

বাঁধন রহমানঃ

আমরা মনে করছি জামাতের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক মেরুদন্ড ভেঙে গেছে এবং বাংলাদেশের জামায়াতী ইসলাম আগামী দিনগুলোয় মাথা তুলে দাঁড়ানো তো দূরের কথা,মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে না। আমাদের এই ধারণা যে কত বড় ভুল তা বোঝা যায় দেশি-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা,জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন মূল্যায়ন করলে। তাদের তথ্যমতে,জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন।সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানকে জামায়াতের অর্থনৈতিক ভিত্তির উৎস মনে করছে সেগুলো আসলে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মালিকানাধীন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান। জামায়াত মূলত পরিচালিত হয় কর্মীদের দেওয়া মাসিক ও বার্ষিক চাঁদার ভিত্তিতে।

সাম্প্রতিক গবেষনায় উঠে এসেছে যে,অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে তারা অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিমত্তা অর্জন করেছে। তারা অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করার জন্য চুপটি করে ঘাপটি মেরে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছে। ছাত্রশিবির ও ছাত্রী সংস্থার কর্মী সংখ্যা তারা জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েছে। মূল দলের কর্মী সংখ্যা কতটা বাড়িয়েছে তা অনুমান করা যায় সাম্প্রতিক কালে তাদের পরিসংখ্যান মূল্যায়ন করলে। জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তির চালিকা শক্তির ঘূর্ণায়মান কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসের নাম ‘রুকন’। দলটির ‘রুকন’ পদমর্যাদার কর্মীরাই হলো দলের প্রাণ। তারা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহন করে ‘রুকন’ হিসেবে অভিষিক্ত হন। জামায়াতের সব কর্মী সমর্থক কিংবা শিবিরে যোগদান করা সমর্থক ও কর্মীরা সারা জীবন ধরে স্বপ্ন দেখেন রুকনরুপে অভিষিক্ত হয়ে দলের জন্য নিজের জীবন,পরিবার ও সহায়-সম্পত্তি বিসর্জন দিয়ে গাজীরুপে বেঁচে থাকতে নতুবা মরে গিয়ে শহীদি মর্যাদায় জান্নাতলাভের জন্য।

জামায়াতের একজন কর্মী যেদিন রুকন পদে অভিষিক্ত হন সেদিন থেকে তিনি তার মাসিক অথবা বার্ষিক আয়ের শতকরা ১০ ভাগ থেকে শুরু করে ২৫ ভাগ পর্যন্ত অর্থ-সম্পদ সংগঠনকে দান করেন। তার দলের জন্য যেকোন ঝুঁকি গ্রহন,জীবন বিসর্জন অথবা দলকে সেবা করার মানস নিয়ে সর্বদা নিজেকে প্রস্তুত রাখেন। জামায়াতের প্রয়াত আমির ‘গোলাম আজম’ যেদিন মারা গিয়েছিলেন সেদিন সারা দেশে রুকনের সংখ্যা ছিল ৫৫হাজার যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০হাজারে।

উপরোক্ত পরিসংখ্যান ও তথ্য থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে যে জামায়াত কিভাবে তাদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এছাড়াও আমরা যদি সাম্প্রতিক ওয়াজ-মহাফিল গুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে,ঐসব ওয়াজগুলোর প্রধান অতিথি,বিশেষ অতিথি করা হয় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকে। যারা রাত্রি ১১টার মধ্যেই বক্তৃতা দিয়ে বাড়ি গিয়ে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়েন। এদিকে ওয়াজ চলে গভীর রাত পর্যন্ত। ওয়াজের যেসব বক্তা অতিথি হিসেবে আসেন তারা কোন না কোন ভাবেই জামায়াত পন্থী,যা আমরা অনেকেই জানি না। তারা বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে চালায় দলের প্রচারণার কাজ। এই সব প্রচারণার কাজ তারা করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপনে। আমরা আর লক্ষ্য করলে দেখব এক শ্রেণীর মানুষ, তারা যেখানেই ওয়াজ হোক না কেন সেখানেই গিয়ে উপস্থিত থাকে।

এরা কারা? এরা সেইসব জামায়াতের কর্মী যারা ওয়াজের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মিলিত হন এবং প্রচারণা চালিয়ে দলের জন্য নতুন নতুন কর্মী বাহিনী তৈরি করে থাকেন। দিন দিন ওয়াজ-মহাফিলের পরিমান যেমন বেড়ে চলেছে, সেই তালে বেড়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক এই অপশক্তি জামায়াতের দৌড়াত্ত্ব। এমনিতেই আমাদের দেশেকে সাম্প্রদায়িকরণের একটা চেষ্টা অতীত থেকে হয়ে আসছে,সেই জায়গায় জামায়াতের এই ওয়াজ কেন্দ্রিক যে কার্যক্রম তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এখানে আরও যেটা আতংকের বিষয় তা হল,জামায়াতের এসব কার্যক্রম ঘটছে প্রশাসনের নাকের ডগায় অথচ প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে। যা সরকারের দূর্বলতা এবং ছাড় দেয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সরকার যে তলে তলে জামায়াতের সাথে একটা আতাত করে চলেছে তা উপরোক্ত কার্যক্রম এবং সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। তবে সরকার যদি চিন্তা করে থাকে যে,এই যোগসাজশ করে আগামীতে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার রাখবে তাহলে তারা ভুল পথেই আছে।কারণ জামায়াতী ইসলাম এমন এক দল যারা নিজের সার্থের বাইরে কিছুই দেখে না। তারা ক্ষমতাসীনদেরকে ব্যবহার করে আগামীতে আরও বৃহৎ শক্তি হিসেবে সবার সামনে আসবে।

আমি গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলা নির্বাচনের উদাহরন দিয়েই লেখাটি শেষ করব। গত ১৫মার্চ ২০১৪ সদর উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের যে প্রার্থি নির্বাচিত হয়েছিলেন তাকে কেউ-ই তেমন চিনত না, অথচ তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। যদিওসেই সময় তার নামে কিছু মামলাও ছিল। কিন্তু তারপরও তিনি কিভাবে জিতলেন এটা সবার কাছে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। পরবর্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে,তার রাজনৈতিক কর্মীবাহিনী অন্যান্য প্রার্থীদের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে সেই সব প্রার্থীর প্রচারনা করবে বলে তাদের কাছ থেকে লিফলেট নিয়ে গিয়ে গোপনে গোপনে জামায়াতের প্রার্থীর প্রচারণা চালিয়েছে। এখানে আরও যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হল,এই সব কর্মীরা যখন লিফলেট নিয়ে মানুষের দাঁড়ে দাঁড়ে গিয়েছে তখন তারা সাথে করে ছোট ছোট কোরআন শরীফ নিয়ে যেত, যার উপর ভোটারের হাত রেখে ওয়াদা নিত। তাদের আরও একটা কৌশল ছিল,যে সময় এই নির্বাচন হয় ঠিক ঐ সময় দেশে যুদ্ধাপরাধী মামলায় “সাঈদী’ জেলে। আমরা সকলেই জানি সাঈদীর ওয়াজের একটা গ্রহনযোগ্যতা আছে সারা দেশেই। জামায়াতের কর্মীরা এটা খুব ভালো করেই জানত, তাই তারা সাঈদীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা ভোটারদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই বলে প্রচার চালায় যে,আপনারা যদি সবাই ভোট দেন তাহলে ‘সাঈদী’ সাহেব মুক্তি পাবে এবং এই কৌশলে তারা শতভাগ সফল হয়েছে।

“বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ” এই বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছিল বলেই অনেক আগে থেকেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করার জন্য বারবার আহবান জানিয়ে আসছে। কমিউনিষ্ট পার্টি আরও বলছে,আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গৃহীত যে চারটি মূলনীতি রয়েছে তাকে পূনঃপ্রপ্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে আমাদের দেশে কখনই কোন সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না এবং বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়ীক রাষ্ট্র।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।