সুত্রপাত / গল্প অথবা উপন্যাস / চিন্তার চেতনা || মোঃছানা উল্লাহ সেলিম
kolom picture

চিন্তার চেতনা || মোঃছানা উল্লাহ সেলিম

নবযৌবনের পা রাখা একজন যুবকের চোখে মুখে হাজার স্বপ্ন দৃশ্যমান হয়। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাবা মায়ের শেষ সম্বল বসতবাড়ি বন্ধক বা বিক্রি করে অথবা অন্যজনের কাছ থেকে ঋণ বা লাভের বিনিময়ে টাকা নিয়ে ছেলেকে ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিদেশ পাঠান। যুবকরাও চোখে মুখে হাজার রঙ্গে স্বপ্ন নিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্য পাড়ি দেন দূরদেশ প্রবাসে। অচেনা জায়গা, অচেনা শহর, অচেনা মানুষ গুলোর এই অচেনাটা মানিয়ে নিতে মাস ছয়মাস চলে যায়। এর মধ্যে দেশ থেকে বাবা-মা ফোন করে কেমন অাছে ছেলে জানতে চায়, হাজার কষ্টের মাঝে থেকেও যুবক বলে মা অামি ভালো অাছি। অাগামী ১ তারিখে টাকা পাঠাবো। বন্ধকী জমিটা ছাড়াইয়া নিও। অালিফের পরীক্ষা ফি দিয়ে দিও। বাবা মা জানতে চায় ছেলে বিদেশে কি কাজ করে। যুবক অনেক কষ্টদায়ক বিল্ডিং এর কাজ করেও বাবা-মাকে  খুশি করার জন্য বলে অামি একটা অফিসে কাজ করি। এভাবে কেঁটে যায় দীর্ঘ সাতটি বছর। কোন রকম পরের ধার-কর্য কিছুটা কমলো। এরপর ৩ মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফেরার পালা। দেশে অাসার অাগে বাবার জন্য পাইজামা-পান্জাবী, মায়ের জন্য শাড়ী আর ছোট ভাইয়ের জন্য শার্ট-প্যান্ট এবং অাত্নীয় স্বজনের জন্য অনেক কিছু কিনলো। ২ দিন পর দেশে ফিরলো।

পরিবারের সবার সাথে হাসি খুশি করে ১ মাস কেঁটে গেলো। ভাবছিল সুন্দর একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করবে কারণ যুবকের বয়স পরিপূর্ণ যৌবনে গেলো। এর মধ্যে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো যুবকের, অার এবার বিয়ে করা হলো না। বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল অার ডাক্তার দেখাতে দেখাতে বাকী ২মাস কেঁটে গেলো। এদিকে বাবার অসুস্থতার জন্য অাবার নতুন করে কিছু ঋণ হল। অসুস্থ বাবাকে অার বৃদ্ধা মাকে ও অাদরের ছোট ভাইকে ফেলে অাবার ও ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে দূর প্রবাসে পাড়ি জমাতে হল। ৩ দিন পর অাগের মতো কাজে গেলাে। কিন্তু কাজে মন বসে না, রাতে ভালোভাবে ঘুমাতেও পারে না। বার বার অসুস্থ বাবা অার বৃদ্ধা মায়ের কথা মনে পড়ে। কাউকে বলতাম না শুধু চোখের জ্বল দিয়ে প্রতি রাতে বালিশ ভিজে যেত। এভাবে চলতে  লাগলো কয়েক মাস। হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে ছোট ভাই অালিফের ফোনে,হ্যালো বলার সাথে সাথে ছোট অালিফ কান্নাস্বরে বললো, ভাইয়া বাবা অার পৃথিবীতে নেই।

সেইদিন যুবকের মাথার উপর অাকাশ ভেঙ্গে পড়লো। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা অন্ধকারে ভরে গেলো। বাবাকে হারিয়ে শোক কেঁটে স্বাভাবিক অবস্থায় অাসতে সময় গেলো অারো ১ বছর। বাসায় বৃদ্ধা মা  অার ছোট ভাইটাও পড়ালেখার কারণে বেশিরভাগ সময় কাঁটায় শহরে। এর মধ্যে যুবকের বয়স প্রায় যৌবনের শেষপ্রান্তে। বৃদ্ধা মায়ের একা বাসায় থাকতে অনেক কষ্ট সেইটা বুঝতে পেরে অাবারও ৩ মাসের ছুটি নিয়েছে। যুবক সিন্ধান্ত নিলো এবার হলেও একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করবো। দেশে ফেরার অাগে মায়ের জন্য শাড়ী, ছোট ভাইয়ের জন্য শার্ট প্যান্ট, সু অার নতুন বউয়ের জন্য লাল বেনারসি শাড়ী, সুগন্ধি, স্বর্ণ অলংকার। ২ দিন পর দেশে ফিরলো। ২দিন পর বাড়ীর কিছু কিছু জিনিস মেরামত করালো। তারপর বউ দেখা শুরু হয়ে গেলো ১ মাসের প্রায় শেষের দিকে একটা সুন্দর পরীর মতো মেয়ে খোঁজে পেলো। যার বয়স সবে মাত্র ১৮ হবে। তার সাথে সামাজিক ভাবে বিয়ের কাজটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা হলো।

নতুন বউয়ের অাদর সোহাগ যুবকের প্রতি দিন দিন বাড়তে লাগলো। এদিকে ছুটি শেষ হতে লাগলো। যুবকের মাথায় অাকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তবু ও সব কিছু মেনে নিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্য অাবারও বিদেশ পাড়ি জমাতে হবে। যেই দিন বিদেশ পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বাহির হলো সেইদিন পরিবারের সবাই যুবককে  বিদায় দিতে এর্য়ারপোটে গেলো। সকাল ১০টা এয়ারপোর্টের ভেতরে ডুকার অাগ মূহূর্তে নব যৌবনি বউয়ের একান্ত অালাপ কালে….

“বউ কানে কানে বললো, অাবার কবে অাসবে অামার নবযৌবনের মাঝি, তোমায় ছাড়া কাঁটবে না অামার দিন রজনী” যুবক চোখের কোণে জ্বল লুকিয়ে বললো, এবার খুব তাড়াতাড়ি  ফিরবো অামার লক্ষী বউ, বৃদ্ধা মায়ের থেকে কোন কথা নেই, শুধু অাঁখি থেকে জ্বল গড়িয়ে বুক ভেসে যাচ্ছে, ছোট ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললো মার প্রতি খেয়াল রাখিস।

বউকেও বললো মায়ের যত্ন নিও। যুবক চোখের জ্বল লুকিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। যুবকের দিন যাচ্ছে ভালো ।একদিন বন্ধের  দিনে যুবক বাসায় বসে বসে টিভি দেখতেছে হঠাৎ শিরোনামের লেখার প্রতি খেয়াল করলো, লেখাটি এমন ছিল “প্রবাসীর নববধূর পরকিয়ায় প্রেমিকের হাত ধরে পলায়ণ। এ লেখাটা দেখে মাথার উপর যুবকের অাকাঁশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে মাকে ফোন দিল। মা ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে বললো, মা তোমার বউমা কোথায়? মা বললো, অাছে বাবা। মা ওকে ফোনটা দাও। মা বউমার হাতে মোবাইল ফোনটা দিলো। যুবক বললো, জান কেমন অাছো, বউ উত্তরে বললো ভালো অাছি। অাচ্ছা, অামি পরে কল দেবো বলে যুবক লাইনটা কেঁটে দিলো। সেই দিন থেকে এদিকে বৃদ্ধা মায়ের চিন্তা অন্য দিকে নববধূর চিন্তা, ছোট ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করার চিন্তা। যুবক প্রতি দিন ঠিকমতো কাজে গেলেও রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না। বৃদ্ধা মায়ের অসুখ কি বাড়লো কিনা ? অামার নববধূ কি পরকিয়া প্রেমে অাসক্ত হল কিনা ? ছোট ভাইটা কি ঠিক মতো লেখাপড়া করছে কিনা ? এভাবেই কাঁটতে থাকে প্রবাসী যুবকের প্রতিটি রাত।

লেখক: তরুণ গল্পকার।

Comments

comments

error: Content is protected !!