সুত্রপাত / রাজ্যের যুক্তি-তর্ক / গাছ মানেই কাঠ নয়, গাছ মানে প্রাণের প্রয়োজনে প্রাণের অংশগ্রহণ

গাছ মানেই কাঠ নয়, গাছ মানে প্রাণের প্রয়োজনে প্রাণের অংশগ্রহণ

চিন্ময় গোস্বামী পাপ্পু:

ধন্যবাদ জানাচ্ছি যশোর রোডের গাছ কাটার বিপক্ষে দাড়ানো যশোরবাসী সহ সারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী সংবেদনশীল জনগনের প্রতি। সময়মত গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে জনগনের ন্যায্য দাবীর প্রতি গুরুত্ব দেয়ার জন্য হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকেও সাধুবাদ জানাই। একদম স্পষ্টভাবেই বলতে চাই গাছ কাটা বাতিলের বর্তমান সরকারী সিদ্ধান্তের সর্বোচ্চ কৃতিত্ব তাদেরই যারা এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবীতে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে জনমত গঠনের কাজ করেছেন, এবং প্রাণ রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে যারা আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। কারণ সরকারীভাবে এ নিয়ে দুইবার গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও সেটা বাতিল হয়েছে। ফলে যদি কেউ এরকম চিন্তা করে যে এখানে সরকারকে সাধুবাদ জানানোর দরকার আছে আমি ব্যক্তিগতভাবে সে সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছি। এরপরেও বেশ কিছু বিষয় আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, যেহেতু বিভিন্নভাবে এ ইস্যুতে জনগনের সাথে কাজ করেছি সেহেতু এ প্রশ্নটা যশোরবাসী সহ সারাদেশে এ ইস্যুতে যারা কাজ করেছেন তাদের সামনে উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

গণমাধ্যমের প্রচার অনুযায়ী বর্তমানে গাছ রেখেই বিদ্যমান রাস্তা সংস্কারের সরকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাহলে এখানে জনগনের প্রাপ্তিটা গাছগুলোর সাময়িক রক্ষার বাইরে আর কি থাকলো!যদি পরিবেশের ক্ষতির ব্যাপারে জনগনের সিদ্ধান্তের প্রতি সরকার গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়ে থাকে তাহলে যারা গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের মূল উদ্দেশ্যটা কি ছিলো এবং জনগনের দাবীকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র সরকারী ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জনগনের উপরে চাপিয়ে দেয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে এবং আদৌ কোন ব্যবস্থা নিয়েছে নাকি সেটাও জনগনের সামনে পরিস্কার করাটা সরকারী দায়িত্ববোধের মধ্যেই পড়ে।

যদি বর্তমান রাস্তা সংস্কারটাই সরকারী সিদ্ধান্ত হয় তাহলে উন্নয়নের নাম গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয়ার যৌক্তিকতা থাকে তখনই যখন সেখানে বিকল্প উপায় না থাকে, যদিও সরকারী মহল প্রথম থেকেই প্রচার করে আসছিলো রাস্তা চাল লেন কিম্বা ছয় লেনে উন্নিত করার সিদ্ধান্ত নেযা হয়েছে, কিন্তু আদতে বর্তমানে সংস্কার এবং তিন মিটার প্রস্বস্ত করা ছাড়া আর রাস্তা চার লেন কিম্বা ছয় লেনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানে তো ব্যাপারটা ঠিক ওইরকম না। বারবার গণমাধ্যমে এসেছে যে রাস্তার দুইপাশে কমবেশী প্রায় ৫০ ফুট করে সরকারী জমি দখল করে আছে রাস্তা ব্যবহারকারীদের তুলনায় একদম জিরো পার্সেন্টেরও কম কিছু মানুষ যারা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে ক্ষমতা প্রশ্নের কাছাকাছি ছিলেন। সেখানে কোন নির্দিষ্ট মতাবলম্বি মানুষ নয়, যারা আছেন তারা হয় সরাসরি ক্ষমতাকাঠামোর সাথে জড়িত, কিম্বা কোন না কোনভাবে তাদের দ্বারা ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষেরা এই দখল করে থাকার সুবাদে সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। ফলে জনগনের চাপে পড়েও এই সরকার এই জিরো পার্সেন্টেরও কম মানুষের সুবিধার প্রশ্নটাকে আড়াল করতে পারছেন না।

টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প বলতে আমরা বুঝি সেই উন্নয়ন প্রকল্প যা একই সাথে উন্নয়নের সাথে জনগনের জানমালের কোন হুমকির কারণ হবেনা। ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে বাংলাদেশ পরিবেশের ভারসাম্যের ক্ষেত্র সর্বোচ্চ হুমকিতে থাকা রাষ্ট্রগুলোর প্রথম ছয়টির মধ্যেই আছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশ্ন আসলে সকলের আগেই যে বিষয়টা সকলের আগে বিবেচনায় আসা উচিৎ তা হলো পরিবেশের ভারসাম্যের কথা। যেহেতু সরকার জনগনের চাপে পড়ে পরিবেশের ভারসাম্য বিবেচনায় সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে সেহেতু এটা এখন প্রমাণিত সত্য যে এই উন্নয়ন প্রকল্পের শুরু থেকেই পরিবেশ বিষয়ে কোন সমীক্ষা না চালিয়েই এ প্রকল্প চালিয়ে দেয়া হয়েছে, অন্যন্য প্রকল্পগুলোতে উন্নয়নের নামে পরিবেশের ভারসাম্যের ব্যাপারে কতটা গুরত্ব দেয়া হচ্ছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন করার কিম্বা জনগনের সামনে আসাটা এখন একদমই অবশ্যম্ভবী হয়ে দাড়িয়েছে, ভুলে গেলে চলবেনা রামপাল বিদ্যূতকেন্দ্র প্রকল্পেও পরিবেশের ভারসাম্যের কথা বলেই বিপূল জনমত গঠন করা হয়েছিলো, যদিও সরকার সেখানেও কোন জনমতের তোয়াক্কা না করেই সে প্রককল্প এগিয়ে নিয়ে চলেছে । যদিও প্রথম থেকেই এখন পর্যন্ত যারা বাস্তবসম্মত, জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নে তুলনামূলক কম ক্ষতির সম্ভাবনা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যুগোপযোগী এবং সরকারী দখলকৃত জমি পুনোরুদ্ধার করে বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, তাদেরকেই বলা হয়েছে উন্নয়নবিরোধী।

বর্তমান বাস্তবতা যেখানে দাড়িয়েছে সেখানে শুধু যশোর রোড নয়, খুলনা বিভাগের বেশীরভাগ রাস্তায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকের কি অবস্থা সেটার প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তবে সেটা আলোচনার দাবী রাখে। ব্যবহার অযোগ্য রাস্তা শুধুমাত্র জনগনের বিপূল অংশের জীবনের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপই নয় একাধারে জনগনের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারী বিপূল পরিমান সম্পদ অপচয়ের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। যা সংস্কার করার দায়িত্ব বর্তায় সরকার, সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রণালয় এবং এর পাশাপাশি এলজিআরডি অধিদপ্তরের উপর। দীর্ঘদিন এ দায়িত্বকে তারা ক্ষমতার দাপটে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেও এখনও পর্যন্ত তারা জনগণ কতৃক তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্বকে নিজেদের উন্নয়ন প্রকল্প বলেই চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে যদি যশোর রোডের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বাতিলের ব্যাপারে যেহেতু এটা দ্বিত্বীয় সিদ্ধান্ত সেহেতু পরবর্তীতে যে গাছ কাটার ব্যাপারে আবার সিদ্ধান্ত নেয়া হবেনা তার কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা। এমনকি লোকমুখে খবর পাওয়া যাচ্ছে যশোর রোডের পাশের মানুষদের কাছ থেকে গাছ না কাটলে রাস্তা সংস্কার হবেনা, সে ব্যাপারে গণস্বাক্ষর কর্মসূচীও নেয়া হয়েছে। ফলে সাময়িক রক্ষা হলেও আসলেও গাছগুলো রক্ষা পেলো কিনা সে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে কিম্বা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাছগুলোকে রক্ষার বর্তমান সিদ্ধান্তে আপ্লুত হওয়াটা পূর্বের মতই জনগনকে ধোঁকা দেয়ার সামিল।

একটা ব্যাপার বলা হচ্ছে এটাকে নাকি এশিয়ান হাইওয়ে করা হবে। হতে পারে, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যাদের অন্তত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে তাদের পরিকল্পনা কিম্বা বিদ্যাসাগর সেতুর ব্যাপারে সামান্য ধারণা আছে তারারা অন্তত বর্তমান বাস্তবতায় যশোর রোডের পুরোটাকেই এশিয়ান হাইওয়ে করার ব্যাপারে ভারতের মতামত যে পাবেনা, সেটাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। সে বিষয়ে আগ্রহ থাকলে বরং পরবর্তীতে আলাপ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত আক্রমণ বাদ দিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে ঐক্যমতে পৌছানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

যাহোক এত সংকটের মধ্যেও পরিবেশ রক্ষায় জনগনের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহন প্রমান করেরে বাংলাদেশে চাইলেই জনগনের দাবীকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব, তাই সে যতই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকুক। অন্যদিকে এটাও নিশ্চিত নই, যে গাছগুলোকে চুড়ান্তভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে এসেছে। কারণ এখানে জড়িয়ে আছে অর্থ লুটপাটের সামান্য স্বার্থ যার জন্য শাসকেরা বিপূল জনগনকে হুমকীর মধ্যে ফেলতে পিছপা হবেনা, সেটা প্রমাণিত সত্যতে পরিণত করেছে এই গাছ কাটার প্রকল্প এবং সাহস দেখাতে পারছে শুধুমাত্র ক্ষমতা প্রশ্নের কাছাকাছি থাকার সুবাদে। তারা জনগণকে ক্ষমতাহীন করতে পেরেছে বলেই এধরনের দূঃসাহস দেখাতে পারছে।

তাই জনগনের জেগে ওঠা প্রয়োজন ক্ষমতা প্রশ্নে। জনগনের বিচ্ছিন্নতাকে পুঁজি করেই তারা নিজেদের লুটপাটকে জায়েজ করতে পারছে। জনগনের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারবে গাছ রক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় নীতিমালা প্রস্তুত করতে যাতে করে যশোর রোড সহ সারা বাংলাদেশের গাছগুলোকে রক্ষার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে একইভাবে সরকারী দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার করেই রাস্তা সম্প্রসারণ কিম্বা চার লেন বা ছয় লেনের রাস্তাও করা সম্ভব হবে।

লেখক: সমন্বয়ক, গণসংহতি আন্দোলন, যশোর জেলা।

Comments

comments