সুত্রপাত / গল্প অথবা উপন্যাস / কোথায় যাবে তুমি ?

কোথায় যাবে তুমি ?

মোর্শেদ আলম সাকিল:

আকাশের বিয়ে হল কিছুদিন আগে। বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হয়েছে। পরিবারের কোন চাপ ছাড়াই আকাশ ও আশা ও বিয়েতে রাজি হয়েছিল। আশার মন ভয়ানক খারাপ। হঠাত্‍ করে খারাপ হয় নি। প্রতিদিন একটু একটু করে খারাপ হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিনের মন খারাপগুলোকে সে মুছে ফেলতে পারে নি। তাই সেই ছোট ছোট মন খারাপগুলো একত্রিত হয়ে এক বিশাল মন খারাপের তৈরি করেছে। তারপরও সে স্বাভাবিকভাবে চলার চেষ্টা করে। নতুন বউ সে তার আচার ব্যবহার সবাই লক্ষ্য করবে এ কথাটা আশা বুঝে। তাই সে তার মন খারাপটা কাউকে বুঝতে দেয় না, লুকিয়ে রাখে।

একজন হয়তো বুঝতে পারে! সে আকাশ। এই আকাশের জন্যই আশার মন খারাপ। বিয়ের ১৫ দিন হলো অথচ আকাশ আশার সাথে তেমন কথাই বলে না এ বিষয়টা আশাকে প্রতি মুহুর্তেই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সংসার নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখত সে ছোটবেলায় যখন সে পুতুলের বিয়ে দিত তখনই এই স্বপ্নের বীজ রোপণ করে সে। এই স্বপ্নটাকে পরিচর্যা করতে গিয়ে বান্ধবীদের মত আর প্রেম করা হয়ে উঠেনি আশার। কিন্তু এত যত্নে পালিত হওয়া স্বপ্নটার সাথে কিছুই যে মিলছেনা। সে এখন প্রায়ই একটা কথা চিন্তা করে। আকাশ কি তাহলে এ বিয়ে মেনে নিতে পারে নি? তার পছন্দ কি অন্য কেউ ছিল? আশাকে কি আকাশের পছন্দ হয় নি? এই প্রশ্নগুলো প্রতিক্ষণেই আশার মনে তীরের মত বিঁধছে। তার হৃদয় নামের বস্তুটা থেকে যে পরিমাণ রক্ত ক্ষরিত হচ্ছে ঠিক একই পরিমাণ নোনতা পানি বের হচ্ছে তার চোখ থেকে। কিন্তু সেই রক্তক্ষরণ ও চোখের পানির খবর কাউকেই পেতে দেয় নাহ সে।

আকাশ একটা নামী দামী ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করে। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় খুব কম সময়েই চাকরিটা পায় সে। আর চাকরি পাওয়ার পরপরই বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ দিতে থাকে। প্রথমে না বললেও পরে আর পরিবারের সাথে জেদাজেদি করে না আকাশ। বিয়ে ও বউ এই দুটো নিয়ে ফিলিংসের শেষ নেই আকাশের। কলেজ লাইফ থেকেই সে বন্ধুদের প্রেম নিয়ে ফিলিংস দেখে আসছে। তাদের প্রেম ও প্রেমঘটিত বিষয়গুলো খুব কাছে থেকে লক্ষ্য করেছে আকাশ। এগুলো দেখে তারও প্রেম করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু কেউ তার মনে তখন প্রেমধনুর একটি রঙের ছাপও ফেলতে পারে নি। তাছাড়া পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছাত্রজীবনে আর প্রেম করা হয়ে ওঠেনা আকাশের। তবে প্রেম না করেও প্রেমানুভূতিগুলো সে বুঝতে পারত। নিজের মনের রং দিয়ে সে তার মনের দেয়ালে একটি অবয়ব আঁকত। যে অবয়বটি সে কখনো দেখেনি। অবয়বটি মনের দেয়ালে থাকলেও সে
এটিকে ছুঁতে পারত। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রঙে রাঙাত। আকাশ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে সেই অবয়বের সাথে আশার কি আশ্চর্য মিল!  আশার মুখখানার প্রতিচ্ছবি নদীর স্বচ্ছ পানির ঢেউয়ের মধ্যে যেমন দেখাবে অবয়বটি যেন ঠিক সেরকমই ছিল। নিজের
কল্পনার চেহারাটির মানুষটিকে এত কাছে পেয়েও আকাশ কথা বলত না। আকাশ মনের দিক থেকে বেশ স্মার্ট ছেলে। সে মেয়েদের সাথে কথা বলতে পারত না, এমন নয়। তারপরও সে আশার সাথে কথা বলে না।

বাইরে অবশ্য মানুষকে দেখানোর জন্য ওরা দুজনই ভালোই অভিনয় করে। এই অভিনয় টুকুতেই আশা যা একটু কাছে পায় আকাশকে। অভিনয়টা শেষ হয়ে গেলেই তার মন খারাপের পাহাড়টা বড় হতে থাকে। এই অভিনয়ের বাইরে যখন আশা আকাশের সামনে থাকে তখন সে ভয়ে, আতঙ্কে রীতিমত কাঁপতো। এসবের কোন কিছুই এড়াত না আকাশের চোখকে। কিন্তু তারপরও সে কথা বলত না। একদিনের ঘটনা, আকাশ সেদিন বেশ আগেই অফিস থেকে বাসায় ফিরল। ফিরে দেখল আশা
লুকিয়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আকাশ কর্কশ গলায় ডাকল, “আশা” আশা চমকে উঠে ঘুরে দেখে আকাশ দাড়িয়ে আছে। সেই মুহুর্তে আশার চেহারা ভয়ে, আডঙ্কে, লজ্জায়, আকস্মিকতায় যে রূপ ধারণ করল তা আকাশের মনের সেই দেয়ালে
গিয়ে ঘা মারল। আকাশের কলিজার কাছ দিয়ে মৃদু একটা বাতাস বয়ে গেল। কলিজায় এরকম বাতাস লাগলে মানুষ নরম হয়ে যায়। কিন্তু আকাশ হল না। সে আগের মতই দাড়িয়ে আছে। কিন্তু আশা আর সেখানে দাড়িয়ে থাকতে পারল না। সে চোখের পানি
আড়াল করতে দ্রুত পদে সরে পড়ল।

আশা আকাশকে প্রচণ্ড ভয় পায়, সেই সাথে প্রচণ্ড ভালবাসে এবং শ্রদ্ধাও করে। সেদিন বিকেলে আকাশকে চা দিয়ে গেল ওর মা । আকাশ চা শেষকরে বলল, “আম্মা আজকের চা’টা কিন্তু অসাধারণ বানিয়েছো”। মা বলল, “আমি কি এখনও চা বানাইরে? চা তো বানিয়েছে তোর বউ।” আকাশ শুধু আস্তে করে বলল, “ও। আচ্ছা ” এই “ও আচ্ছা” টাইপের শব্দগুলো শুনেই আকাশের প্রেমে পড়ে আশা। পরম আরাধ্য মানুষটির কাছ থেকে যখন খুব সামান্য পরিমাণ প্রশংসা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাওয়া যায়, তখন সেই সামান্য প্রশংসাই ব্যাপক ভালবাসার যোগান দেয়। আশার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না।

আরও একদিনের ঘটনা,  আশা কাঁদতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় আকাশের কাছে। আকাশ জানে, আশা কেন কাঁদছে। আজও আকাশ দাঁড় হয় আশার সামনে। তবে আজ আর তেমন কঠিনভাবে দাঁড়াতে পারল না,  সে আজ অনেক নার্ভাস, তার পা আজ কাঁপছে, কিন্তু এসবের কিছুই দেখতে পেল না আশা। সে চোখের পানি মুছে সেদিনের মত সরে পড়তে চাইল। কিন্তু আকাশ আশাকে যেতে দিল না। তার হাতটি ধরে অন্য পাশে মুখ করে আছে আকাশ। বিস্ময়ে শিহরিত হয়ে উঠল আশা আকাশ দুজনই কাঁপছে।

আকাশ অনেক কষ্টে বলা শুরু করল। “আশা… , না জানি তুমি কত কষ্ট পেয়েছ এই একমাস। তুমি হয়তো ভেবেছিলে আমি তোমাকে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস কর তুমিই আমার একমাত্র কল্পনা চারিণী। সেই কলেজ জীবন থেকেই আমি তোমাকে কল্পনা করে আসছি, এটুকু বলার পর একটু থামে আকাশ। আর আশা বিস্ময়ে, ভয়ে শুধু ঠকঠক করে কাঁপছে। চারদিকে কি ঘটছে সেকিছুই জানেনা। সে কার সামনে দাড়িয়ে আছে সেটা সে জানে কিন্তু ভাবতে পারছে না। সে পাথরের মত দাড়িয়ে শুধু কথাগুলো শুনছে “আমি আসলে এই একমাস মিলিয়ে দেখছিলাম। তুমিই আমার সেই কল্পনার মানুষ কিনা।কিন্তু কি জান, তুমি আমার কল্পনার মানুষটির চেয়ে একটু ব্যতিক্রম।” এটা শুনে আশার চোখগুলো বড় হয়ে উঠল। তার হৃদয়ে যেন আরেকটা বিষে মাখা তীর ঢুকল। ‘ব্যতিক্রম’ শব্দটা তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দিল।

আকাশ আবারো কথা বলা শুরু করে। কিন্তু তার এতদিনের জমানো সব কথাগুলো একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ফলে তার মুখে একটা বড় ধরনের “কথাজ্যাম” লেগে গেল। এক বোতল মার্বেলকে একসাথে বোতলের মুখ দিয়ে বের করতে চাইলে যেমনএকটি মার্বেলও বের হয়না তেমনি অবস্থা এখন আকাশ। কিন্তু তারপরও সে অনেক কষ্টে আবার বলা শুরু করল,
“তুমি আমার কল্পনার মানুষের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। কারণ আমার কল্পনার মানুষটা অপূর্ণ ছিল। আমি তাকে পুরোপুরি সাজাতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমি ঐ মানুষটিকে আর সাজাতে যাইনি। সাজাবো কি করে। সে তো নিজেই আমার সামনে সেজে আছে।”

আশা এখন পুরো গুমোট অবস্থায় আছে। তার চোখমুখ ১০ নম্বর মহাসুখ সংকেত ঘোষণা দিচ্ছে। মনের মধ্যে ঝড় শুরু হয়েছে। ঝড়টা একটু কমলেই চোখ দিয়ে বৃষ্টি পড়া শুরু করবে। আকাশ আর কিছু বলতে পারছেনা। মুখে একরাশ জড়তা নিয়ে সে আশাকে বলল, “আই লাভ ইউ” নিজের বিয়ে করা বউকে কেউ এত জড়তা নিয়ে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছিল কিনা তা আকাশ
জানে না…

আকাশের এই তিন শব্দবিশিষ্ট বাক্যটা আশার মনে বিদ্যুতের ঝলক হিসেবে কাজ করে। সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় অশ্রুবৃষ্টি। ছোট বাচ্চার মত কাঁদতে কাঁদতে সে আকাশকে ঘুষি মারতে শুরু করল। আকাশ পুরা হতভম্ব হয়ে গেল। আবেগে মানুষের আচরণের পরিবর্তন ঘটে তা আকাশ জানে। কিন্তু তাই বলে এতটা! যে মানুষটাতাকে দেখলে ভয়ে কাঁপত সেই মানুষটাই এখন তাকে ঘুষি মারছে! এটা নিয়ে গবেষণার সময় আশা আকাশকে দিল না। আশা কাঁদতে কাঁদতে আকাশের বুকে মাথা রেখে বলল, “এতদেরি করলে কেন? আমি যদি চলে যেতাম, কি হত তাহলে?” আকাশ আশাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি
যেতে পারতে নাহ তা আমি ভালভাবেই জানি। আমি এও জানতাম তুমি আমাকে ভালবাসো। আর তারপরও যদি ভালোবাসার অধিকারে অভিমান করে চলে যেতে, তাহলে আমিও তোমার মান ভাঙাতাম, তোমাকে এমনি করে কষ্ট দেয়ার পর নিজের ভালবাসার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে চমকে দিতাম। আর তুমি এমনি করে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে। কোথায় চলে যাবে তুমি? তোমাকে তো আমি সেই কবে থেকেই বেঁধে রেখেছি। এ বাঁধন ছেড়ার ক্ষমতা তোমার নেই। এ বাঁধন গড়তে যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আমাকে সাহায্য করেছেন। কোথায় চলে যাবে তুমি? তুমি যে আমার স্বপ্নচারিণী, তুমি যে আমার বউ।

রাত গভীর হচ্ছে। আর এভাবেই ওদের কথোপকথন এগিয়ে চলছে,  এক মাসের জমানো কথোপকথনএক রাতেই শেষ করতে চাচ্ছে ওরা। রাত শেষ হয়ে যায়, দিন চলে যায়, ক্যালেণ্ডারের পাতা বদলাতে থাকে, নতুন বছরের ক্যালেণ্ডার স্থান পায় ওদের ঘরে। কিন্তু তাদের কথা শেষ হয় না। আরো নতুন করে জমা হতে শুরু করে।

লেখক: তরুণ কথাসাহিত্যিক।

Comments

comments