সুত্রপাত / চিন্তা ও দর্শন / কার্ল মার্কস প্রসঙ্গ: নৈতিকতা ও মানবিকতা

কার্ল মার্কস প্রসঙ্গ: নৈতিকতা ও মানবিকতা

মোর্শেদ হালিমঃ

মার্কসবাদী বিরোধী শিবির প্রথমই যে আঘাতটা করে তা হচ্ছে মার্ক্সবাদে নৈতিকতার কোন স্থান নেই। মার্কস-এঙ্গেলস কে শয়তান হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে একজন টাকার উড উন্নতম। হ্যা, আমাদের স্বীকার করতে আপত্তি নেই, মার্কস-এঙ্গেলস সনাতনী নীতিবিদ ছিলেন না, উনারা অপরিবর্তনীয় ধ্রুব নীতিসর্বস্ববাদী কায়দায় যে নৈতিকতা তৈরি হয় তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কসের পূর্বের দার্শনিকদের বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখব কেউ কেউ ধর্মের প্রত্যাদেশ কে মেনে নেয় আবার কেউ কেউ নৈতিকতার মানদণ্ডের জন্য একটি অপরিবর্তনীয় সত্তা হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন। তারা মানবসমাজের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য একটা স্থির নৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেন। যার সঙ্গে জগৎ জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। জগৎ পরিবর্তনশীল, মানুষের চিন্তা-ভাবনা বদলে যায়, ব্যক্তিভেদে অনুভূতিতে রয়েছে পার্থক্য। অথচ নীতিবিদরা দাবি করেন, নৈতিকতা হতে হবে অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব ও শাশ্বত। কার্ল মার্কস বলেন, “ইহুদীরা নিজেদের ইহুদি হিসেবে মুক্তির দাবি করার মধ্য দিয়ে মানবজাতি থেকে তারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।” তাই আমরা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নৈতিকতাকে মানবসমাজের নৈতিকতা বলতে পারি না। তাদের নৈতিকবোধ বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। অন্যের উপর বাধ্যতামূলক ভাবে চাপিয়ে দেয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নৈতিকতা হতে হবে সার্বজনীন যা মানবসমাজের প্রত্যেকের জন্য সমভাবে গ্রহীত।

পুঁজিবাদ যে নৈতিকতার কথা বলে, মানবতাবাদের কথা বলে, স্বাধীনতার কথা বলে তা যে মানবসমাজের সঙ্গে কত বড় প্রতারণা, অধস্তনকরণ, লুঠ, পাশবিক বর্বরতা, বঞ্চনা তা কার্ল মার্কস তাদের সমালোচনায় বর্ণনা করেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক নিজেকে হারায়, তার শ্রম উৎপন্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উৎপন্ন হয়ে ওঠে শ্রমের বা শ্রমিকের বিরুদ্ধ বিষয়। উদ্বৃত্ত মূল্য বা মুনাফা মালিক আত্মসাৎ এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকের শ্রম-সময় শোষণ করে। মালিক শ্রমিককে তার স্বকীয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এই বিচ্ছিনতা থেকে সে স্বাধীনতা হারায় এবং মজুরি দাসে পরিণত হয়। তার কাজের ফল তার নিজের না হয়ে অপরের হয়। অনুরূপ ধার্মিকও মানবসেবামূলক কাজ করে, ঈশ্বরের জন্য তখন সেটা হয়ে ওঠে একটি জবরদস্তিমূলক ক্রিয়া। এভাবেই ধর্মে ও পুঁজিবাদে বিচ্ছিন্নতার ফলে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা হারায়। এইটা অন্যায় নয়? এইটা অনৈতিকতা নয়? প্রায়িক সত্য হল পুঁজিবাদে নৈতিকতাই হল অনৈতিকতা: আর অনৈতিকতা, মুনাফা আত্মসাৎ, শোষণ, বিচ্ছিন্নতাই হল নৈতিকতা।

এই ঘটনাটা শুধু একজন শ্রমিকের বেলায় নয়। এইভাবেই গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনৈতিকভাবেই মানবসমাজে টিকে থাকে। এরাই আবার আইন-কানুন তৈরি করে, নীতিজ্ঞ নীতিনির্ধারক হিসেবে সুন্দর, শুভ, মঙ্গলের স্বপ্ন দেখায় কখনো কখনো ছিনিয়ে নেয়া জমানো উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে দান খয়রাত করে জনদুরদী এবং মানবতাবাদের বুলি উড়ায়। মানুষের বিচ্ছিন্নতা দূরকরণে তাদের সামনে হাজির করে ধর্মের নৈতিকতা ও ঈশ্বরের ভয় যদিও তাদের বেলায় এই নৈতিকতার বালাই নেই। মার্ক্সবাদ সত্যই এই ধরনের নৈতিকতা ও মানবতাবাদ কে অস্বীকার করে। অস্বীকার করে শ্রম-সময় আত্মসাৎ এর ফলে মালিক যে স্বাধীনতা ভোগ করে তাকেও।

তার মানে এই দাঁড়ায় না মার্ক্সবাদে নৈতিকতা নেই, মানবিকতা নেই, স্বাধীনতা নেই। আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখব, ধর্ম ও পুঁজিবাদ যে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় তাতে মানুষ নৈতিক হয় না তো সত্যই; বরং আরো বেশী আত্মকেন্দ্রিক করে তুলে। আত্মকেন্দ্রিকতাবাদের মূল কথা হল “সবার সঙ্গে সবার যুদ্ধ” যার লক্ষ্য মানবিক সম্প্রদায় নয়। মানবিক সমাজ তখনই তৈরি হবে যখন মালিক মুনাফা ব্যক্তিগত ভাবে আত্মসাৎ না করে মানুষে মানুষে সত্যিকার সমন্বয়ী জীবন প্রতিষ্ঠিত করবে। কার্ল মার্কস বলেন, মানুষ যদি তার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে মানবিকতা অর্জনের জন্য পরিবেশকেই করে তুলতে হবে মানবিক।

এই থেকে বলা যায় বিদ্যমান পুঁজিবাদী পরিবেশটাকেই কার্ল মার্কস অমানবিক ও তার সকল উপাদান যেমন, প্রেম-ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, বিচার ও বিবেকবোধ সহ ভাবগত চিন্তা-ভাবনার মনোবৃত্তি কে অনৈতিক বলেন এবং এর বিপরীত অবিচ্ছিন্ন শ্রম-সময়, পরস্পর ঐক্যের ভিত্তিতে এমন এক পরিবর্তনশীল সামাজিক সত্তা নির্মাণ করা যা হবে মানবিক মানুষের নৈতিকতার মানদণ্ড। যার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তই হবে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে।

শেয়ার করুন
  • 18
    Shares

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!