সুত্রপাত / রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা / কারো ঘর পুড়ে , কেউ আলু পোড়া খায়

কারো ঘর পুড়ে , কেউ আলু পোড়া খায়

আবদুস ছাত্তার খানঃ

কারো বাড়ি আগুন ধরলে সেখানে নানা রকম লোকই যায়। কেউ যায় আগুন নিভাতে, কেউ যায় শুধু তামাশা দেখতে আবার কেউ যায় কয়েকটা আলু পোড়া দিতে। কোটা আন্দোলন নিয়ে এই প্রবাদটা আমার খুব মনে পড়ছে। এখানে শুধু আন্দোলনের কর্মীরাই আছে তা নয়। সরকার বিরোধী নানা দলমতের লোকরাও আছে। থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সবাই যার যার দল-মত-আদর্শের যায়গা থেকে কথা বলবে এটাই প্রত্যাশিত। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, এটাই গণতন্ত্রের বিউটি। কারো যখন সরকারি দল করার অধিকার আছে তেমনি কারো সরকার বিরোধী দল করার অধিকারও আছে। এবং বিরোধী দলগুলো যেন তাদের মতামত নির্বিঘ্নে প্রকাশ করতে পারে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর। কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো চলে জনগণের টাকায়, জনগণের ট্যাক্সে। কিন্তু তা না হয়ে তারা যখন কারো ভারাটে বাহিনীতে পরিণত হয়, তখন তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা জনগণের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে। যেমন হয়েছিল ৭১ সালে , যেমন হয়েছিল ৯০ এ। জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে যদি সে দিন আওয়ামলীগকে সরকার গঠন করতে দিতো তাহলে কী এই বাংলাদেশ স্বাধীন হতো? বঙ্গবন্ধু ২৫ শে মার্চের রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন , গ্রেফতার বরণ করেছেন । ওনি আওয়ামলীগের অন্য নেতাদের মতো ভারত চলে যান নি। কারণ তিনি জানেন তিনিই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নেতা, পাকিস্তান সরকার চালানোর বৈধ দাবিদার। কিন্তু সে দিনের সেই পুলিশি রাষ্ট্র তা হতে দেয় নি।

তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহারা করেছে, বাংলার প্রায় সমস্ত জনগণকে নির্যাতন করেছে। আর এই নির্যাতের হাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই জন্ম হয়েছে এই বাংলাদেশের। দাম দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত। লক্ষ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত, দুই কোটি মানুষের শরণার্থী জীবন। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে ছিনিয়ে আনতে হয়েছে স্বাধীনতার লাল টকটকে সূর্যকে। এতো ত্যাগ তিতিক্ষার পরে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, সেই স্বাধীনতা কেউ যেন খর্ব করতে না পারে কেউ যেন আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে না পারে তার জন্যই রচিত হয়েছে সংবিধান। আমার মত প্রকাশ করা , আমার দাবি আদায় করা আমার সাংবিধানিক অধিকার । আমার এই অধিকার যে খর্ব করবে , আমার মত প্রকাশের অধিকারকে যে দমন করতে চাবে তার বিরুদ্ধেই আমি রুখে দাড়াবো, তার বিরুদ্ধেই আমি আন্দোলন করবো। যেটা ৯০ এ করা হয়েছে, যেটা করা হয়েছে তত্বাবয়াক সরকারের বিরুদ্ধে। আর এটাই মুক্তযুদ্ধের চেতনা, এটাই মুক্তযোদ্ধাদের আমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করা।

আমরা অবিশ্বাস করবো না এই আন্দোলনের ভিতরে স্বাধীনতা বিরোধী একটা মহল ঢুকে পড়েছে। তারা নানা ভাবে বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে নানা কুটুক্তি করে থাকে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। আন্দোলনের কর্মীদের এদের প্রতি সজাগ থাকতে হবে। আন্দোলনের প্রথম দিক থেকে আমি দেখেছি ছাত্রলীগের একটা বড় অংশ এই আন্দোলনে সহায়তা করে আসছে। সত্যি বলতে কী ছাত্রলীগের সমর্থন না থাকলে এই আন্দোলন কখনো দানা বাধতো না। ছাত্রলীগে পোস্টপ্রাপ্ত আমার কাছের অনেক ছোট ভাইকে দেখেছি তারা সরাসরি ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে। কর্মীদের সাহস যুগিয়েছে। বলতে গেলে তাদের উদ্যেগেই এবং দুর্বার আন্দোলনের ফলে আওয়ামলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রদের সাথে বসতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। ফলে আন্দোলন থিতিয়ে এসেছিলো প্রায়।

প্রত্যেক দলের ভিতরই একটা হাইব্রিড অংশ থাকে। যারা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের আশায় তৈল মারতে থাকেন নেতাদের । যেমন ছিলো বঙ্গবন্ধুর সময়। আওয়ামলীগের একটা অংশ সর্বদা বঙ্গবন্ধুর নিকট কান ভারি করতে থাকেন তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে। সেই মোস্তাক গং অংশটাইকেই আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর পাড়া দিয়েই তারা সরকার গঠন করে। অথচ বঙ্গবন্ধুর পিতার মৃত্যুর সময় নাকি এই লোকটাই বেশি কান্না করেছিল, এই লোকটাই ছিলো শেখ মুজিবের এক ছেলের উকিল বাপ। আর মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রথম মন্ত্রীসভা আওয়ামলীগের নেতৃত্বে আওয়ামলীগের লোকদের দিয়েই গঠন করা হয়েছে।

তেমনি এই আন্দোলনেও ছাত্রলীগের যে অংশটা এই উগ্রতা দেখাচ্ছে এরা সবাই আগামী কাউন্সিলের পদপ্রত্যাশী বা বিভিন্ন সুবিধে প্রত্যাশী। বিশ্বাস না হলে খেয়াল করেন ছাত্রলীগের যে নেত্রীকে জুতার মালা পড়িয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলো, কে কে বের করে দিয়েছিলো, কেন তাকে প্রটেকশন না দিয়ে এতো উত্তেজিত ছাত্রদের মাঝে ছেড়ে দেয়া হলো? তারপর একটা অংশ প্রচার করতে থাকে ছাত্রলীগ কাউকে ছাড়ে না এমন কী নিজের দলের নেত্রীকেও না । অখচ কী আশ্চর্য আমাদের মতো কিছু মানুষ যখন মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রতিবাদ করতে থাকি এবং সেই দাবি জোরালো হতে থাকে তখন গণেস পাল্টে যায়। দেখা গেল যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো তারাও ছাত্রলীগ।

তাই ছাত্রলীগের ভাইয়েরা আগুন ধরলে শুধু মানুষ আগুন নেভাতে আসে না অনেক মানুষ আলু পোড়া খেতেও আসে। এই আন্দোলনের ভিতরেও তেমনি নানা মত-পথের লোক ঢুকে গেছে। তারা চাইবেই সরকারকে বিব্রত করতে। তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে এটা প্রমাণ করা যাবে না যে এই আন্দোলন অন্যায্য। তাদেরকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার আপনাদের নেই।
একটা রাজনৈতিক ইস্যুকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করুণ। আপনারাও গণজামায়েত করুন। দেখেন কতোজন ছাত্র –ছাত্রী আপনাদের ডাকে সাড়া দেয়। মাস্তানী গুণ্ডামী করে কোন গণআন্দোলনকে স্তব্দ করা যায় না। ভুলে যাবেন না আমাদের বাহান্ন আছে, উনসত্তর আছে , একাত্তর আছে, নব্বই আছে, আছে শহীদ মিনার, আছে ৩২ নম্বর বাড়ি, আছে বঙ্গবন্ধু, আছে শহীদ জোহা, আছে আসাদের শার্ট। যুগ যুগ ধরে এরাই আমাদের রক্ষা করবে।

জয় বাংলা।

শেয়ার করুন
  • 89
    Shares

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!