এ যুগের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী এবং তাদের রক্ষার উপায়

//এ যুগের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী এবং তাদের রক্ষার উপায়

এ যুগের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী এবং তাদের রক্ষার উপায়

আর্য সারথী:

আমরা তাদের রোজই দেখি। বিশেষ ধরনের পোশাক পরা। তারা ছেলে হতে পারে আবার মেয়েও হতে পারে। তারা কেউ বয়সে ছোট, কেউ বড়। তারা প্রত্যেকেই প্রতিদিন এক বিশেষ জায়গায় যায়,আবার ফিরেও আসে। কেউ যায় একা, কেউ যায় বাবা-মায়ের হাত ধরে কিংবা দল ধরে। তাদের পিঠে থাকে বিশাল বড় বড় ব্যাগ যার ভর প্রায় বাহকের সমান! ব্যাগের ভারে এদের নুয়ে পড়তে হয়। তবে ভাবার কোনো কারণ নেই এরা শিশুশ্রমিক বা পাতা-কাগজ কুড়ানীর দল। এরা হলো আমাদের প্রাণশক্তি! এদের উপর নির্ভর করে গোটা সমাজ, গোটা দেশ। হ্যাঁ,এরা শিক্ষার্থী। এরা শিক্ষালাভ করে একদিন বড় হবে। আশা করেছিলেন বলব বড় মানুষ হবে। কিন্তু বড় কথাটি বললেও মানুষ হবে কথাটি লিখলাম না, লিখতে ইচ্ছে করেনা। কারণ আছে এর অনেক।

এইযে শিক্ষার্থীর দল রোজ বড় বড় ব্যাগ নিয়ে বিদ্যার্জন করে, এই অর্জিত বিদ্যা কি কোনো মানবিক বিদ্যা? আমরা জানি,অন্যান্য প্রাণী ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষের মনন। প্রাণ থাকলেই প্রাণী হওয়া যায়, কিন্তু মনন ছাড়া মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা যে বিদ্যা গেলাচ্ছি বা নিজেরা গিলছি তার মধ্যে মানবিকতা কতটুকু আছে, সৃষ্টিশীলতা বা মননশীলতা কতটুকু আছে তা ভাবার সময় এসেছে। বর্তমান শিক্ষার মাঝে আছে ভোগবাদী প্রবণতা। শিক্ষাব্যবস্থাটাই এমন প্রক্রিয়ায় ঢেলে সাজানো হয়েছে যে এর মধ্যে ঢুকলে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি-সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে যাবে। ব্যাপারখানা গোড়া থেকে বোঝা দরকার। কারণ ঢালাওভাবে কোনো কথা বলার মানে হয়না। প্রত্যেকটি কথার পেছনে যুক্তি থাকা চাই। যুক্তিই সব, যার মাঝে যুক্তি নেই তাকে দিয়ে আর যাই হোক কল্যাণজনক কিছু হয়না।

সর্বপ্রথম বোঝা দরকার শিক্ষা জিনিশটা কি? শিক্ষা এমনই এক বস্তু যার দ্বারা মানুষের বোধশক্তি বা মনন উন্নত,মুক্ত ও উদার হয়।কথা হতে পারে  কার থেকে মুক্ত করা বা উন্নত করা? নিশ্চিতভাবেই, সকল প্রকার মূঢ়তা, অন্ধতা,সীমাবদ্ধতা ও জড়তা থেকে।অর্থাৎ শিক্ষার অর্থ হলো সত্যকে বোঝা ও সত্যের পথে এগিয়ে চলা। এর সাথে রয়েছে কল্যাণের সম্পর্ক। মূলত শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তৈরি করে। কারণ শিক্ষা মানুষকে যেমন উন্নত মননশক্তি দেয় তেমনি উৎসাহ দেয় মানুষ তথা সমগ্র
জগৎকে বুঝতে, এগুলো নিয়ে কাজ করতে এবং সাহস জোগায় সকল প্রকার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে। বর্তমান শিক্ষায় এগুলো কি আছে? অনেক পণ্ডিতপ্রবর প্রশ্ন তুলতে পারেন আগের শিক্ষায়ওতো এতকিছু ছিলনা, তাহলে এখন এত কথা উঠছে কেন? আমরা এর উত্তর দেব এভাবে যে, আগে মানুষ ভালো ছিলনা বলেইতো উন্নত হতে চাইছে। মানুষ এত পরিশ্রম করছে নিশ্চিতভাবেই একটি সুন্দর জীবনের জন্য। যদি কিছু বাগাড়ম্বরপূর্ণ বুলি দিয়ে কাজের কাজ কিচ্ছু না করা হয় তবে এসব কি প্রতারণা নয়? আগে ও পরের শিক্ষা কোনো বড় কথা নয়। কারণ এরমধ্যে বিশেষ কোনো চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটেনি । বরং চাকাটা পেছনের দিকেই ঘুরছে। আমরা যদি আজ থেকে দুশো বা দেড়শ বছর পেছনে চলে যাই এবং কিংবা ১৯৭১ এর আগের কিছু সময় চিন্তা করি তাহলে বুঝব তখনকার শিক্ষাব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিলনা, কিন্ত এখন সেসময়ের ভালো জিনিশগুলোও
ছেঁটে ফেলে দেয়া হচ্ছে। আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম বলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। তারপর কি হলো? শিক্ষার মূল বিষয় যে জ্ঞানার্জন তা আজ কোথায়? বর্তমানে শিক্ষা হয়ে গেছে ব্যবসা আর শিক্ষার্থীরা তার প্রোডাক্ট বা পণ্য!  আগে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের যাও কিছু চোখ খুলত এখন চোখ খোলাতো দূরের কথা চোখ রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের সকলের শিক্ষাগ্রহণের সমান সুযোগ আছে কি? প্রত্যেক সচেতন মানুষ নেতিবাচক উত্তর ছাড়া কিছু দিতে পারবেন না। আমরা আজও আমাদের শিক্ষার মানদণ্ড তৈরি করতে পারিনি।বিকৃত, বানোয়াট, সীমাবদ্ধ বা অর্ধসত্য কথা মিশিয়ে যাই লেখা হোক তা পড়ানো হয়। তাছাড়া দিনকে দিন শিক্ষাকে দূর্লভ করা হচ্ছে। এর আসল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাগ্রহণ সম্পর্কে আমাদের মনে একটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের কল্পনাশক্তিকে বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার আনন্দকে প্রকাশ করার জন্য আহবান করেছিলেন।বস্তুত কল্পনা নিছক কল্পনা নয় এর সাথে রয়েছে সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক, সোজাকথা মানুষকে ভাবতে শেখানো। কিন্তু বর্তমানের শিক্ষা হলো “গুরুত্বপূর্ণ “বিষয় মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বস্তা বস্তা কাগজ জড়ো করা ও চাকরী করা। অর্থাৎ আমরা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, আমরা যা শিক্ষা দিচ্ছি তা হলো সহিংসতা, অমানবিকতা,যান্ত্রিকতা ও  ভোগবাদ। এছাড়া বিভিন্ন রকম ভুল ধারণা ও কুসংস্কারতো ঢোকাচ্ছিই।

আমরা এমন পাঠ্যবই প্রণয়ন করি যা শিক্ষার্থীদের কাছে বিষতুল্য মনেহয়। আমরা মুখে বলি যে,শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের অতিরিক্ত পড়া উচিত। কিন্তু আমরা এমন ব্যবস্থাই করে রেখেছি যে তারা অন্য বই পড়তেই পারবেনা। তাদের মাথায়
প্রতিযোগিতা, চাকরি, আয়রোজগার এর কথা আগেই এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে শিক্ষাগ্রহণ করতে তারা আর প্রস্তুত থাকেনা। শিক্ষার্থীরা এখন এমন ব্যস্ত হয়েছে যে তাদের শৈশবকালকে উপভোগ করতে পারেনা। আমরা তাদের শৈশবকে গলাটিপে হত্যা করছি।

এখন এতকিছুর পর আমরা কি শিক্ষা থেকেই পিছুটান দেব? এটাতো পলায়নবাদী নীতি। পলায়নবাদ দিয়ে পরিবর্তন আসেনা। আমাদের প্রতিকারের পদক্ষেপ দিতে হবে। এই প্রতিকারের জন্য কয়েকটি প্রস্তাবানা নিম্নে দেওয়া হলো:

১) শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বপ্রথম জোর দিতে হবে মানুষের মানবীয়তাকে প্রকাশ এর ব্যাপারে, যাতে একজন প্রকৃত মানুষ তৈরি হয়।
২) শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা দিতে হবে নীতি, যুক্তি, মূল্যবোধ, বিনয় (শৃঙ্খলা, নম্রতা) এবং জীবজগৎকে ভালোবাসার।
৩) প্রাথমিক শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আনতে হবে।
৪) তৃতীয়  শ্রেণী পর্যন্ত বাঙলা, ইংরেজী ও গণিতের বেশি বই পড়ানো যাবেনা, তবে সুকুমার বৃত্তির প্রস্ফুটনের জন্য চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, আবৃত্তি ইত্যাদি থাকতে পারে।
৫) চতুর্থ শ্রেণী হতে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পূর্বের তিনটি বই বহাল রেখে তার সাথে সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম, সাধারণ বিজ্ঞান যুক্ত করতে হবে।
৭) সপ্তম শ্রেণী হতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকালে ইতিহাস,সরল অর্থনীতি, সরল রাষ্ট্রবিজ্ঞান ,ইংরেজী ও বাঙলা ব্যাকরণ, শারীরিক শিক্ষা, সরল প্রযুক্তিপাঠ পাঠ্য করা হবে। (এই সময়ে সমাজবিজ্ঞান নামে কিছু থাকবেনা। তাছাড়া বাংলা ও ইংরেজী
ছাড়া কোনো ১ম ও ২য় পত্র থাকবেনা)
৮) দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কোনো বিভাগ থাকবেনা।
৯) দ্বাদশবর্ষ শিক্ষাকালে কেবল একটি/অথবা দুটি পাবলিক পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে।
১০) প্রাথমিক শিক্ষা সারাদেশে একমুখী হতে হবে।
১১) শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
১২) চিত্তবিনোদন এর পরিশীলিত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
১৩) শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়াতে হবে।
১৪) পরীক্ষা পদ্ধতির বদল আনতে হবে।
১৫) সমস্ত শিক্ষাপীঠ জাতীয়করণ করতে হবে
১৬) শিক্ষাকে সুলভ করতে হবে।
১৭) ভাল মানের পাঠ্যবই প্রস্তুত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বা কোচিং করতে না হয়।এমনকি নোটবই ও গাইড বই যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে ভাল পাঠ্যবই এর বিকল্প নেই। তবে এক্ষেত্রে গাইড কম্পানীর সাথে যে কর্মসংস্থান জড়িত তাকে বিবেচনায় নিতে হবে।তাই সেসব কম্পানীকে পাঠ সহায়ক বই(কিন্তু বোর্ড বই এর নোটবই নয়) ছাপতে দিতে হবে।
১৮) শিক্ষকদের খাদ্য ও আবাসন এর দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে যাতে শিক্ষকদের এই দুই কাজের পেছনে সময় নষ্ট না করতে হয়।
১৯) প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা এই দুই ভাগ ছাড়া শিক্ষার অন্যপ্রকার বিভাজন বাদ দিতে হবে।
২০) প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষায় অবশ্যই বাঙলার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
২১) বাংলাদেশে যারা আদিবাসী ও ভিন্নভাষার জাতি আছে তাদের ভাষায় শিক্ষালাভ তাদের মৌলিক অধিকার।তাই তাদের মৌলিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে অতি দ্রুত তাদের ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করে উদ্যোগ নিতে হবে যাতে তাদের শিক্ষাটা তাদের ভাষায় দেয়া যায়(সবটা হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু ৭০%কাজ করাই যায় সদিচ্ছা থাকলে।) এভাবেই আশাকরি আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী দুইই রক্ষা পাবে।

লেখক: ছাত্র।

শেয়ার করুন
  • 44
    Shares
By | ২০১৮-০৫-১৮T১৩:৫৯:৪৪+০০:০০ ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮|রাজ্যের যুক্তি-তর্ক|Comments Off on এ যুগের শিক্ষা ও শিক্ষার্থী এবং তাদের রক্ষার উপায়