“আমার সারাজীবনের জন্য এই একটা দিন ?” লজ্জাজনক !

//“আমার সারাজীবনের জন্য এই একটা দিন ?” লজ্জাজনক !

“আমার সারাজীবনের জন্য এই একটা দিন ?” লজ্জাজনক !

সুদর্শনা চাকমা:

বছর ঘুরে মার্চ মাসের আট তারিখ  আসলেই কেন আমার কথা বলবেন ? আমি কি কেবল এই দিনেই নারী হয়ে উঠি ? শুধুমাত্র এই দিনেই কি আমার অধিকার আর প্রহসনের কথা বলবেন ? কোন দুঃখে ‘হ্যা ‘ উত্তর দিতে যাবেন বলুন ? তাহলে যে আমি আপনাকে চরমভাবে সন্দেহ করবো ! আপনি আমার মত কেউ নন ! আপনি যেই হোন আমার দেখার বিষয় নয়।  আমার অবস্থান থেকে আমি নিজে আমি হয়ে উঠি। পৃথিবীর আদি থেকে অন্ত আমি আমার অস্তিত্বকে দারুণভাবে অনুভব করি। জীবনের শুরুতে যখন থেকে আমার পিউবার্টি এসেছিলো তখন থেকে অনুভব করি আমার প্রতিমাসে পিরিয়ড হয়। পিরিয়ডের কষ্টে সংকোচে প্রতিমাসে জর্জরিত হই। আমার প্রজননতন্ত্র আলাদা। হরমোনজনিত কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য আমি সবসময় ভিন্ন। মানুষ হিসেবে নিজেকে পৃথিবীর এক অনন্য উপহার মনে করি। ঠিক যখন এভাবে পরম সুখ স্পর্শ করি তখন আমার চারপাশে অসংখ্য কালো হাত আমার শরীর রক্তাক্ত করে।

আমি দেখতে পাই ওরা আমার স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় প্রতিমাসে পিরিয়ডের রক্ত দেখলে দাঁত খেঁচিয়ে হাসে। আমি এতসুন্দর মানুষটা তখন পিরিয়ডের রক্তে রঞ্জিত হয়ে নিজেকে খুন করি। মানুষ থেকে হয়ে যাই নারী। নারী হবার চরম অপরাধবোধ তখন আমার মনুষ্যত্বকে খুন করে ফেলে। আমার প্রজননতন্ত্রের কোন অধিকার বোধহয় কোনজন্মে আসেনি। কচি কচি পেলভিসগুলো সময়ের আগেই কারো ইচ্ছাতে সন্তান প্রসবের নির্মম জ্বালা ভোগ করে। তাতে কি আর এই মার্চ মাসের ৮ তারিখের দরকার হয় ? বাবার সিদ্ধান্তে ইচ্ছা আর চাহিদার জলাঞ্জলী দিয়ে ভরা যৌতুকের লোভে যখন মাঝখানে আমি খুন হয়ে যাই তখন কি এই ৮ তারিখের প্রয়োজন হয় ? অপরিণত বয়সে স্বামীর সংসারে গিয়ে রাতদিন নির্যাতনের প্রহসন সহ্য করতে কি এই আট তারিখের দরকার হয় ?

শিক্ষার আলো পেতে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির গন্ডি পেরোতে গিয়ে ধর্ষণ আর যৌন হয়রানির স্বীকার হতে কি এই আট তারিখের দরকার হয় ? রাজনীতি, অধিকার, কর্মক্ষেত্র, পরিবার সবখানে সবসময় আমি নিজেকে দেখতে পাই। বলুন সেখানে প্রবেশ করতে কি আমার এই আট তারিখের খুব বেশি দরকার ? প্রতিদিন প্রতিমূহুর্তে আমার শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে যারা খেলা করছেন তারা কোন অধিকারে আজ ৮ই মার্চ আমার অধিকারের সপক্ষে স্লোগান দেন ! নিজ পরিবারে, নিজ কর্মক্ষেত্রে, নিজের ? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা মানুষের এই নারীর শরীর নিয়ে প্রহসন করেন তারা কিভাবে কিসের মুখোশ পড়ে নারীর পক্ষে ব্যানার হাতে নিয়ে আজ রাস্তায় নামবেন ? বরং নিজেদের মুখোশ টেনে খুলে ফেলুন !  প্রতিদিন নিজের পরিবার থেকে শুরু করুন আপনারাও আমাদের মতই পৃথিবীর অনন্য উপহার। নারীর শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়াগুলোর উপর সহনশীল হোন, যত্নবান হোন।  তারজন্য এই একটা বিশেষ দিন নয় যখনই প্রয়োজন পড়ে নারীদের কথা বলুন। সহিংসতার প্রতিবাদ করুন।

বিচারের প্রত্যাশায় নয়, বিচার আদায় করে তারপর ছাড়ুন। কেননা এই একটা সত্য আমরা সবাই জানি নারী পুরুষ থেকে নয়, অপরাধ সৃষ্টি হয় নিকৃষ্ট মনের অতি হীনমন্যতা থেকে। তাই বিশেষ কোন আট তারিখে নয় সবসময় সবখানে আমরা আমাদের কথা বলবো। আসুন আমরা অপরাধীর বিচার করি, সুন্দর পৃথিবী গড়ি। দেশের পাহাড় সমতল ছাপিয়ে একের পর এক দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিরোনাম যখন ধর্ষণের হয় তখন কোথায় যায় এই নারী দিবসের ঝকঝকে ব্যানারগুলো ? শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যা, যৌতুকের দাবীতে নৃসংশতা এগুলোও কিন্তু এক একটা ব্যানার হয়ে কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। পাহাড়ে পানি আনতে গিয়ে যে মধ্যবয়সী নারীকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছিলো তার বিচারের দাবীতে কোন ব্যানার কিন্তু কোন আট তারিখে আসেনি ! যে আদিবাসী কিশোরী জুমক্ষেতে গিয়ে দিনে দুপুরে সেনাবাহিনীর কাছে ধর্ষিতা হয়ে মারা গিয়েছিলো তার বিচারের দাবী নিয়েও কোন ব্যানার এই আট তারিখে আসেনি !

কল্পনা চাকমার অপহরণ সে এক বিশাল রাক্ষসপুরীর গল্প হয়ে আছে ! স্বাক্ষী প্রমান নিষ্প্রাণ দেহে ভর করে আছে ! বিচারের দাবী এই আট তারিখ নয়! বরং এক ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে  বিচার বিলীন হয়ে গেছে । বেসরকারী কিছু সংস্থা কর্তৃপক্ষের টাই প্যান্টের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ নারী দিবস পালন করবে ! সরকারি কিছু র্যালী, স্লোগান নারীর ধুকপুক কম্পন বাড়িয়ে উৎসাহ যোগাবে নারীরা এগিয়ে চলো। আদতে কল্পনা, তনু, ইতিদের মত অসংখ্য বিচার অদৃশ্যে চিৎকার করবে। স্লোগান, প্ল্যাকার্ড নয় যদি এটাও প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি সংবিধান দিয়ে এসব সহিংসতা প্রতিরোধ করা তবে নির্দ্বিধায় এটাও করা উচিত। কেননা রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ কোনটাই নারীকে উপেক্ষা করতে পারেনা। কষ্টদায়কভাবে আমরা প্রায়ই প্রতিদিন সেই সহিংসতার শিরোনাম পড়ি। যাদের ভুমিকা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। অপরাধীর মত আমরা সেই তাদের জন্য এই একটাই দিবস পালন করি ৮ ই মার্চ! এই লজ্জা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের সংহতি দরকার। চেতনাবোধ পরিবর্তন প্রয়োগ সাধন করা দরকার। যেখানে যখন প্রয়োজন হয় মূল্যবোধের প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে দিন। সত্যিকার অর্থে আমরা আর লজ্জিত হবনা।

লেখক: নারী অধিকার কর্মী।

শেয়ার করুন
By | ২০১৮-০৩-০৮T০৮:১৪:৫৯+০০:০০ মার্চ ৮, ২০১৮|নারীর অধিকার|Comments Off on “আমার সারাজীবনের জন্য এই একটা দিন ?” লজ্জাজনক !