সুত্রপাত / ধর্ম ও দর্শন / আমার চণ্ডীচিন্তা

আমার চণ্ডীচিন্তা

আর্য সারথী:

আমি বরাবরই বিচারবাদী। নির্বিচারে কোনোকিছুই আমি গ্রহণ করিনি, করিনা এবং করবও না। তাই বরাবরই কোনো নির্দিষ্ট চিন্তায় বা দর্শনে আমার চিন্তা আবদ্ধ থাকেনি, থাকেনা এবং আশাকরি ভবিষ্যতেও থাকবেনা। আমি সবকিছুকে যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করি। এই মন-মানসিকতা নিয়ে আজ আমি আমার অনেক দিনের সাধ পূরণ করতে চাই। “চণ্ডী ” নামক গ্রন্থকে আমি আমার মতো করে বিশ্লেষণ করতে চাই। অবশ্যই নিছক ধর্মশাস্ত্র হিসেবে এর বিচার আমি করব না। আমি একে দেখি একটা সময়ের মানুষের চিন্তা হিসেবে। তাই এর মধ্যে থাকতে পারে সীমাবদ্ধতা। তবে এরমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ আছে যা আমাদের প্রেরণা জোগাবে। আমাদেরকে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করবে। তাই আমি ভাববাদীদের মতো একে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মানতেও নারাজ আবার যান্ত্রিক বস্তুবাদীদের মতো পুরোপুরি খারিজ করে দিতেও নারাজ। এবার মূল আলোচনায় আসি। চণ্ডীর একটি কথা বেশ জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো: “রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো যহি” অর্থ:আমায় রূপ দাও,জয় দাও, যশ দাও এবং শত্রুনাশ করো।

অর্থাৎ দেবীর কাছে এই হলো মূল প্রার্থনা। এই প্রার্থনার দ্বারা একটি বিষয় পরিস্কার যে এখানে একটি সুখী-স্বচ্ছন্দ জীবনই কামনা করা হয়েছে। কারণ মানুষ ক্রমাগত সংগ্রাম করছে একটি সুন্দর জীবনের জন্য এবং প্রার্থনার মূল বিষয়ই এটি। এর দ্বারা মানুষের ইতিহাসকে খুব ভালো করে বোঝা সম্ভব। বস্তুত মানুষের মাঝে রয়েছে কামনা, এই কামনার দ্বারাই মানুষ সৃষ্টিশীলতা অর্জন করেছে। তাছাড়া চণ্ডীতে আরেকটি প্রয়োজনীয় ধারণা আছে। সে ধারণা নারীত্ব নিয়ে। নারীর গুণ এখানে খুব সুন্দর করে আলোচিত হয়েছে। আমরা চণ্ডীতে দেখব দেবীকে বিষ্ণুমায়া, চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, ছায়া, শক্তি, তৃষ্ণা, ক্ষান্তি, জাতি, লজ্জা, শান্তি, শ্রদ্ধা, কান্তি, লক্ষ্মী, বৃত্তি, স্মৃতি, দয়া, তুষ্টি, মাতৃ ও ভ্রান্তি রূপে বন্দনা করা হয়েছে। আমরা যদি শান্তি, তৃষ্ণা, শক্তি, ক্ষান্তি, লজ্জা, বুদ্ধি, শ্রদ্ধা, কান্তি, লক্ষ্মী, দয়া ও মাতৃ রূপ নিয়েও যদি কথা বলি তবে একটি লৌকিক ব্যাপার চোখে পড়বে। এগুলো থেকে বোঝা যায় নারীর পূর্ণতা মাতৃত্বে।

সব গুণের পরও মাতৃরূপা দেবীর বন্দনা করা হয়েছে। নারীর মাঝে শক্তি, ক্ষমা, বুদ্ধি, তৃষ্ণা আছে আবার নারী শ্রদ্ধার পাত্রী। তবে এগুলোকে পূর্ণতা দেয় মাতৃত্ব। আবার সকল গুণকে দেবী আকারে দেখা হয়েছে , অর্থাৎ এখানে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকবার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। আবার চণ্ডীতে আমরা সমাধি বৈশ্যের কথা পড়ছি যে একেবারে বৈরাগী হতে চাইছে, জগৎকে ছেড়ে যেতে চাইছে। কারণ সে জীবনে ব্যাপক কষ্ট পেয়েছে। তার মানে বোঝা যাচ্ছে বৈরাগ্যবাদের শুরুটা ব্যাপকমাত্রার যন্ত্রণা থেকে। এগুলোই আমার খসড়া প্রস্তাব চণ্ডী নিয়ে।

লেখক: অনলাইন এক্টিভিষ্ট।

Comments

comments