সুত্রপাত / গল্প অথবা উপন্যাস / অপর্ণার বৃহঃস্পতি

অপর্ণার বৃহঃস্পতি

তৃষ্ণা দাশ :

অর্পণার হাত ঘড়িতে ৫.১৭ মিনিট। সে তৎকালিন স্বনামধন্য এক পত্রিকা অফিসে বসে আছে । যদিও এখন এই পত্রিকার নাজেহাল অবস্থা। তবু ও গত ৬ মাসে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে যাওয়া- আসা বিভিন্ন জনের পরামর্শ শুনে শুনে সে যখন একেবারে ক্লান্ত তখনি এই পত্রিকা থেকে তাকে ফোন করল। বর্তমানে এই অফিসে এসে বসে আছে। অপেক্ষার সাড়ে আট মিনিট সময় পার হলো। জনাব আসতে লেট করছে কেন কে জানে। যদিও ওনাকে দোষ দেয়া যায় না। অর্পণা নিজে ৩টায় আসবে কথা দিয়ে যদি ৫টার পর আসে, তবে ওনি স্যার মানুষ, দেরি করতেই পারে। কিন্তু সুখের কথা হল, জনাব অপর্ণাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখেন নি। মোটামুটি ১০ মিনিটের মধ্যে চলে এলেন।

আর যা যা বললেন, তা যথেষ্ট ভাল, কেবল টাকা- পয়সা নিয়ে তেমন আশা করা যাবে না। শুধু যাতায়ত ফি পাবে আর বাকিটা তার কাজের ওপর ডিপেন্ড করে। ১০-১৫ মিনিটের তাদের আলাপে অপর্ণা দারুন খুশি, কিন্তু একটাই সমস্যা, তার বাবা-মা! তারা চাইছেন মেয়ে এসব সাংবাদিকতা জটিল খাটাখাটুনির পেশায় নিজেকে যুক্ত না করুক। তাদের ইচ্ছা জামেলাহীন একটা জব করে বছর খানেকের মধ্য বিয়ে করুক। কিন্তু পূর্ণা ভালো করে জানে, জামেলাহীন আরামের জব মানে এক কথায় সরকারি চাকুরি। সে নিজে মেনে নিয়েছে বি.সি. এস পড়ার মতো এতো মেধা তার নেই আর এতো খাটা-খাটুনি ও তার পক্ষে অসম্ভব।সে মনকে যুক্তি দিয়ে শান্ত করে ফেলেছে, যে জীবনে কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় A+ পায় নি সে পড়বে বি.সি.এস এর পড়া! সে যায় হোক, এসব চিন্তা বাদ। মেইন রাস্তায় দাড়িয়ে আছে টেম্পুর অপেক্ষায়।

বেচারির প্রিয় যানবাহন। টেম্পুতে ঘামের দুর্গন্ধ আর সিগারেট প্রেমিদের ধোঁয়া ছড়ানোর দম বন্ধকর অবস্থা তেমন নাকে সমস্যা করে না। আর মেইন সুবিধা বাসের মতো টেম্পুতে আপত্তিকর ভীড়ে মধ্য ও পড়তে হয় না। আজ তার কপালটা অস্বাভাবিক রকম ভালো। যা নিয়ে ভাবছে তাই চোখের সামনে হাজির হচ্ছে। ২০ মিনিটের টেম্পু ভ্রমন শেষ করল। ব্যাগে ১৮০ টাকা আছে। এই টাকা ব্যাগে রেখে লাভ কি? কাল শুক্রবার। সময় পার করবে কেমনে??? হুম সহজ আর প্রিয় উপায় আছে তার। হাটতে হাটতে পুরানো বইয়ের দোকানে চলে এলো। হালকা খোঁজাখুঁজি করে দুটো গল্প বই ভাড়ায় নিলো। এখন ভাবছে সোজা বাসা টু টিউসন গেলে হলো। স্টুডেন্টের বাসায় অর্পণা, কি বেকুপ টাইপের স্টুডেন্ট এটা। শনিবারে অভির গণিত পরীক্ষা, আর এই বেকুপের অবস্থা…. যেন আজি গণিত বই চোখে দেখল।

যেন আজি গণিত বই চোখে দেখল। সামান্য সংখ্যারেখার অংক করতে করতে বেকুপটা ৭টা থেকে ৯টা বাজালো। মাথা আগুন নিয়ে অপর্ণা আরেকটা স্টুডেন্টের বাসায় বসে আরামে মোবাইলে চ্যাটিং করছে। তার এই স্টুডেন্ট নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই, মোটামুটি রকম ভালো। এমন সময় অপুর ফোন এলো। অপর্না রিসিভ করে বলল “হুম বলো, কি অবস্থা? ” অপু বলল – ‘ভাল। কই আছো তুমি?’ কই আছি বলব না। কেন ফোন করেছ বল? ওমা পূর্ণা, এতো রাগ কেন? কাল চলো ঘুরতে যায়। ‘ একদম না। কাল যাবো না। দুটো বই নিলাম আজ। কোন বইটা আগে পড়ব সেটা বল শুধু। মেয়েবেলা নাকি শোধ?’ পূর্ণা বেশ খুশিখুশি ভাব নিয়ে বলল। দুর না, বই পরে পড়লে হবে। আর এসব কি বই নিয়েছ? ‘হাপ চুপ।

বললে বলো, কোন বইটা আগে পড়ব?’ ওহো হো, প্লিজ চলো নাহ কাল পূর্ণা। এভাবে বলে কোন লাভ নাই গো, আমি কাল যাচ্ছি না। ‘কিন্তু কেন? কাল খুব জোশ একটা জায়গায় যাবো। ভালো টাকা আছে হাতে, টিউসন থেকে টাকা দিয়েছে। প্লিজ চলো। ‘আরে না আমি যাবো না। ‘ ‘ ধ্যাৎ! কেন যাবে না?’ ‘মনে করো তুমি।’ ‘কি মনে করব?’ ‘কিছুই না, ভুলে যাও। ব্রেনকে কষ্ট দিতে হলো না। ভালোই তো।’ – অপর্ণা বেশ নরম স্বরে বলল এই কথা গুলো। ‘ তুমি ওটা এখনো মনে রেখেছো পূর্ণা? ‘ হা, রেখেছি। আমার মেমোরি তোমার মতো না। সব মনে থাকে। গত সপ্তাহে তুমি না করলে, এই সপ্তাহে আমি। রুলসটা তো তুমি এনেছিলে। মনে পড়েছে কি এবার কিছু??? দুর গাধি, এই কারন? আমি ভাবছি কি না কি…. তোমরা মেয়েরা যে কি! ওকে অনেক কোটি সরি বলছি, কাল ৩টা থেকে ৭টা পর্যন্ত আপনার সেবায় নিয়োজিত থাকব। এবার তো রাজি? . . . . . . . না।

না কেন? তোমার ইচ্ছের মতো ঘুরব। আর একটা ব্যাপার আছে গো। যাবে বললে বলব। . . . না বলতে হবে নাহ্। আফসোস করবে কিন্তু পূর্ণা। ডিম।তোমাকে আমি চিনি।সব মুখেমুখে। আরে না সত্যি বলছি। তোমার জন্য শীর্ষেন্দুর একটা বই কিনেছি আজ সন্ধ্যায়। বইটা কাল বিকালে তোমাকে গিফট দিয়ে তোমার খুশি খুশি মুখটা দেখতে চাইছি , সত্যি বলছি পূর্ণা। এবারো কি বলবে, যাবে না? ‘হাহাহা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল বলে এটাকে।’ না তো। এটা হচ্ছে…..! ওকে কাল যাচ্চি, ঠিক ৩টায়। নো লেট। ওকে, বইটা মাস্ট কাল নিয়ে এসো। হুম জানি জানি, আপনি বইটার লোভে আসবেন শুধু। ‘না তো, আমি আসতাম।’ . . . তাই? হুম, বাই এখন? আচ্ছা। শুনো? হা,বলো।

তোমায় এ মুর্হুতে খুব ভালোবাসি।’ অর্পণা বেশ ছোট করে বলল। আচ্ছা, শুধু এই কয়েক মুর্হুতে??? ধ্যাৎ, রাখছি আমি। টাটা….. টাটা… অপর্না মনে মনে হাসে। এই অপুটা একটু বেশি ভালো। খুব ভালো দিনটা, অপুটা আরো অনেক বেশি ভালো করে দিল। এখন অর্পণার মাথায় শুধু আগামী বিকালে অপুর সাথে পাগলামি করার প্ল্যান। অপর্না বিশ্বাস করে, জীবনটা কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছাড়া অনেক বেশি সুন্দর।

Comments

comments